ফিচ রেটিংস, একটি আমেরিকান‑ব্রিটিশ ক্রেডিট রেটিং সংস্থা, রবিবার প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য কাঠামোগত সংস্কার, বহিরাগত তরলতার উন্নতি এবং রাজস্ব সংগ্রহের বৃদ্ধি অপরিহার্য। সংস্থা এই তিনটি ক্ষেত্রকে মুদ্রা‑স্ফীতি, বাণিজ্য ঘাটতি এবং সরকারি ঋণ‑বহন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের মূল হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই শর্তগুলো পূরণ না হলে রেটিংয়ে নেতিবাচক সমন্বয় ঘটতে পারে বলে সতর্কতা প্রকাশ করা হয়েছে।
২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক ও নীতি‑সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশকে স্থিতিশীল করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফিচ রেটিংসের মতে, এই অনিশ্চয়তার হ্রাস নীতি বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে পারে। তদুপরি, নির্বাচনের পর সরকারী প্রোগ্রামগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব।
বিএনপি‑নেতৃত্বাধীন জোট পার্লামেন্টে সুপারমেজরিটি অর্জন করেছে এবং একই সঙ্গে একটি রেফারেন্ডামে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, যা সংবিধানিক সংস্কারের দরজা খুলে দিতে পারে। রেফারেন্ডামের ফলাফল অনুযায়ী দ্বিকক্ষীয় সংসদ, বিচারিক স্বায়ত্তশাসন এবং প্রধানমন্ত্রী পদে মেয়াদ সীমা নির্ধারণের মতো পরিবর্তন প্রস্তাবিত হয়েছে। এসব পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে দেশের আইনগত কাঠামো শক্তিশালী হয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হতে পারে।
তবে দীর্ঘদিনের ক্রেডিট সীমাবদ্ধতা—দুর্বল শাসনব্যবস্থা, ব্যাংকিং সেক্টরের অস্থিতিশীলতা এবং বহিরাগত তরলতার হ্রাস—নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ফিচ রেটিংস জোর দিয়ে বলেছে যে, এই কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করতে সক্ষমতা না থাকলে রেটিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে, ব্যাংকিং খাতে ঋণ‑নগদ অনুপাতের উচ্চতা এবং অ-নন‑পারফরমিং ঋণের বৃদ্ধি আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
সংবিধানিক পরিবর্তনগুলো যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে প্রতিষ্ঠানগত শক্তি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। দ্বিকক্ষীয় সংসদ গঠন, বিচারিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এবং প্রধানমন্ত্রী পদে সময়সীমা আরোপের মতো পদক্ষেপগুলো দেশের শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বাড়াতে পারে। এই সংস্কারগুলো দীর্ঘমেয়াদে নীতি‑নির্ধারণের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করবে।
কিন্তু ফিচ রেটিংস উল্লেখ করেছে যে, এসব সংস্কার বাস্তবায়ন জটিল এবং সময়সাপেক্ষ, ফলে বাস্তবায়ন ঝুঁকি উচ্চ থাকে। রেফারেন্ডামের ফলাফলকে নীতি‑নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে হলে আইনগত প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা সমন্বয় করতে হবে। বাস্তবায়নের সময়সূচি অনিশ্চিত থাকায় বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে চলমান $5.5 বিলিয়ন প্রোগ্রামের অধীনে কর সংগ্রহের দক্ষতা বাড়ানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ফিচ রেটিংসের দৃষ্টিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মূল উপাদান। সংস্থা উল্লেখ করেছে যে, এই পদক্ষেপগুলো যদি ধারাবাহিকভাবে চালু থাকে তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে। করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং ট্যাক্স প্রশাসনের আধুনিকীকরণ দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে।
বহিরাগত তরলতা এখনও নিকট‑মেয়াদে নজরদারির বিষয়, যদিও রিজার্ভে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে। ফিচ রেটিংসের মতে, রিজার্ভের উন্নতি সত্ত্বেও বহিরাগত তরলতার অবস্থা সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন, কারণ তা সরাসরি মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীর আস্থা প্রভাবিত করে। সংক্ষেপে, সংস্কার ধারাবাহিকতা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রোগ্রামের সাথে সমন্বয় এবং বহিরাগত তরলতার দৃঢ়তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রয়ে যাবে।



