ঢাকার উচ্চ আদালত আজ একটি রুল জারি করে গ্রাম আদালত আইন ২০০৬-কে সংবিধানবিরোধী বলে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। এই আইনটি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বিচারিক ক্ষমতা প্রদান করে, যা সংবিধানের ধারা ২২‑এর সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বলে দাবি করা হয়েছে। রুলে সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে কেন এই আইন বাতিল না করা উচিত এবং কীভাবে তা সংবিধানের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়।
বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের বেঞ্চে রুলটি জারি করা হয়েছে, যা ১৫ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ আদালতে ইশরাত হাসান নামে এক জন আইনজীবী দ্বারা দায়ের করা পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (পিআইএল) অনুসরণ করে। ইশরাত হাসান গ্রাম আদালত আইনটির সংবিধানিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং উচ্চ আদালতকে বিষয়টি পর্যালোচনা করার অনুরোধ করেন। রুলে উল্লেখ করা হয়েছে যে আইনটি ২০০৬ সালে গৃহীত হয় এবং তখন থেকে ইউনিয়ন পরিষদের বিচারিক ভূমিকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
পিটিশনে যুক্তি দেয়া হয়েছে যে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কাছে বিচারিক ক্ষমতা প্রদান করা ধারা ২২‑এর মৌলিক নীতি—বিচারিক শাখা ও নির্বাহী শাখার পৃথকীকরণ—কে লঙ্ঘন করে। এই নীতি অনুযায়ী বিচারিক সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে হতে পারে, আর রাজনৈতিক সংযোগযুক্ত স্থানীয় প্রতিনিধিরা যদি ন্যায়বিচার প্রদান করে তবে তা স্বতন্ত্রতা ক্ষুণ্ন করে। এছাড়া পিটিশনকারী উল্লেখ করেন যে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিচারিক প্রক্রিয়াকে পক্ষপাতদুষ্ট করতে পারে, যা সংবিধানের ন্যায়বিচার গ্যারান্টি লঙ্ঘন করে।
পিটিশনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে ধারা ৩৫(৩) প্রত্যেক নাগরিকের দ্রুত, প্রকাশ্য ও স্বতন্ত্র আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে। তবে গ্রাম আদালতগুলোতে প্রশিক্ষিত বিচারক না থাকায় এবং প্রক্রিয়াগুলো প্রায়শই স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় এই অধিকার পূরণ হয় না বলে দাবি করা হয়েছে। পিটিশনকারী বলেন যে গ্রাম আদালতে বিচারিক ক্ষমতা অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের হাতে দিলে ন্যায়বিচারের গুণগত মান হ্রাস পায়। ফলে সংবিধানের এই ধারা লঙ্ঘিত হয় এবং আইনটি সংশোধন বা বাতিলের প্রয়োজন দেখা দেয়।
ইশরাত হাসান নিজে পিটিশনটি দায়ের করেছেন, আর শুনানিতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খান আনিসুর রহমান জিকো ও আবদুল করিম রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বে উপস্থিত ছিলেন। উভয় পক্ষই তাদের যুক্তি উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়েছেন এবং আদালতকে প্রাসঙ্গিক নথিপত্র ও ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। সরকারী দল আইনটির প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা তুলে ধরে বলেছে যে গ্রাম আদালত স্থানীয় বিরোধ সমাধানে দ্রুততা এবং সুলভতা প্রদান করে।
রুলে সরকারকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে কেন গ্রাম আদালত আইন সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কেন তা বাতিল করা উচিত নয়। যদি সরকার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না দিতে পারে, তবে উচ্চ আদালত আইনটি সংবিধানবিরোধী বলে ঘোষণা করে বাতিলের আদেশ দিতে পারে। রুলে উল্লেখ করা হয়েছে যে রায়ের পরবর্তী ধাপ হবে সরকারী ব্যাখ্যা গ্রহণ ও শোনানির তারিখ নির্ধারণ।
এই মামলাটি রাজনৈতিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গ্রাম আদালত ব্যবস্থা দেশের স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় বিচারিক ভূমিকা নির্ধারণ করে। আইনটি যদি রদ হয়, তবে ইউনিয়ন পরিষদের বিচারিক ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হবে এবং স্থানীয় বিরোধ সমাধানে অন্য প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অন্যদিকে, যদি আইনটি বজায় থাকে, তবে সংবিধানিক চ্যালেঞ্জের পরেও সরকারকে সংশোধনী বা অতিরিক্ত তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এই রুলের ফলাফল ভবিষ্যতে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ও বিচারিক সংস্কারের পথে প্রভাব ফেলতে পারে। সরকার যদি আইনটি বজায় রাখতে চায়, তবে সংবিধানিক সংশোধন বা নতুন বিধান প্রণয়নের প্রয়োজন হতে পারে, যা রাজনৈতিক আলোচনার নতুন দিক উন্মোচন করবে। এছাড়া এই বিষয়টি পার্টি-রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলে স্থানীয় নির্বাচনী গতিবিধি ও প্রশাসনিক কাঠামোর পুনর্গঠনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
উচ্চ আদালতের রুলের পরবর্তী ধাপ হবে সরকারী ব্যাখ্যা গ্রহণ ও শোনানির তারিখ নির্ধারণ, যার মাধ্যমে উভয় পক্ষের যুক্তি পুনরায় পর্যালোচনা করা হবে। শোনানির পর উচ্চ আদালত চূড়ান্ত রায় প্রদান করবে, যা গ্রাম আদালত ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গঠন নির্ধারণের পাশাপাশি সংবিধানের মৌলিক নীতি রক্ষার দিকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই রায় দেশের বিচারিক সংস্কার ও স্থানীয় শাসনব্যবস্থার উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।



