ঢাকার মতিঝিলের ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) প্রধান তাসকীন আহমেদ সোমবার তার অফিসে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে চাঁদাবাজি ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তিনি এ বিষয়ে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানান, কারণ এই অবৈধ চাহিদা ব্যবসা চালানোর খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
প্রেস কনফারেন্সে তাসকীন আহমেদ স্পষ্ট করেন, চাঁদাবাজিতে জড়িত ব্যক্তিরা কেবল রাজনৈতিক দলের লোক নয়, পুলিশ, রাজস্ব বিভাগ এবং অন্যান্য সরকারি কর্মচারীরাও এতে অংশ নিচ্ছেন। তিনি বলেন, নতুন সরকারকে এইসব ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করে দায়িত্বশীল করা উচিত, যাতে অবৈধ অর্থপ্রবাহ বন্ধ করা যায়।
চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা বন্ধ করার হুমকি তাসকীন আহমেদ দেন, যা দেশের উৎপাদনশীলতা ও রপ্তানি ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। তিনি উল্লেখ করেন, কারখানায়, অফিসে, এমনকি রাস্তায়ও চাঁদা দিতে হয়, ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং পণ্যের দাম বাড়ে। এই পরিস্থিতি বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের জন্য মারাত্মক, যাদের আর্থিক সহায়তার সীমিত সুযোগ রয়েছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তাসকীন আহমেদ চারটি অগ্রাধিকার উল্লেখ করেন। প্রথমটি হল আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং চাঁদাবাজি সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা। দ্বিতীয়টি হলো সরকারি খাতে স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যাতে বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরে আসে। তৃতীয়টি হল যারা স্বেচ্ছায় ঋণগ্রহীতা নয়, তাদের প্রয়োজনীয় কাজের মূলধন (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) সরবরাহ করা, যাতে তারা পুনরায় ব্যবসা শুরু করতে পারে। চতুর্থটি হল ঋণের সুদের হার যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে নিয়ে আসা, যা ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক চাপ কমাবে।
তাসকীন আহমেদ জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পরেও দুর্নীতি পূর্বের মতোই উচ্চমাত্রায় রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা বাড়তেও পারে। তিনি উল্লেখ করেন, পুলিশ, প্রশাসন, ইনকাম ট্যাক্স অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় দুর্নীতির ছাপ দেখা যায়। এসব অবস্থা যদি অব্যাহত থাকে, তবে দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
বাজার বিশ্লেষকরা তাসকীন আহমেদের মন্তব্যকে ব্যবসায়িক পরিবেশের বাস্তব চিত্র হিসেবে স্বীকার করছেন। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বৃদ্ধির ফলে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা স্বচ্ছ ও নিরাপদ পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেন। এছাড়া, স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়, যা তাদের লাভের মার্জিনকে সংকুচিত করে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তাসকীন আহমেদ কঠোর নীতি প্রয়োগের আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, নতুন সরকারকে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তীব্র বার্তা দিতে হবে, যাতে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত তৈরি হয়। এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে, ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক চাপ হ্রাস পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
সংক্ষেপে, ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের প্রধানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা, কাজের মূলধন সরবরাহ এবং সুদের হার হ্রাসের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব, যা দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে। নতুন সরকারের দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপের প্রত্যাশা ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের মধ্যে উচ্চ মাত্রার প্রত্যাশা তৈরি করেছে।



