ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনায় অস্থায়ী বিরতি আরোপ করা হয়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বৈশ্বিক ট্যারিফ নীতি বাতিল হওয়ায় দুই দেশের প্রতিনিধিরা প্রভাব বিশ্লেষণে সময় ব্যয় করছেন। এই সিদ্ধান্তটি ভারতীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এবং পরিকল্পিত ওয়াশিংটন সফর এখন স্থগিত হয়েছে।
ইন্টারিম ট্রেড চুক্তি চূড়ান্ত করার উদ্দেশ্যে ভারতীয় দল এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল। চুক্তিটি এই মাসের শুরুর দিকে প্রকাশিত হয়েছিল এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভারতীয় পণ্যের ওপর ট্যারিফ ৫০% থেকে ১৮% কমানো অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে চুক্তির কিছু ধারা এখনও স্পষ্ট না থাকায় বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে ট্রাম্পের ঘোষিত ১৫% বৈশ্বিক ট্যারিফের সম্ভাবনা পুনরায় উন্মোচিত হয়েছে। এই নতুন ট্যারিফের প্রভাব কীভাবে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলোর ওপর পড়বে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
গত কয়েক মাসে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২৭ আগস্ট ট্রাম্প সরকার ৫০% ট্যারিফ আরোপ করে, যার মধ্যে রাশিয়ান তেল ক্রয়ের ওপর শাস্তি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পদক্ষেপটি ভারতীয় বাজারে বড় ধাক্কা হিসেবে কাজ করেছিল এবং রপ্তানির খরচ বাড়িয়ে তুলেছিল।
২ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প নরেন্দ্র মোদি সঙ্গে ফোনে আলোচনা করে ইন্টারিম ট্রেড চুক্তি ঘোষণার মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিলেন। চুক্তির শর্তে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প পণ্য এবং কিছু খাদ্য-কৃষি পণ্যের ওপর তার স্ট্যান্ডার্ড ট্যারিফ কমাবে, আর যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় রপ্তানির প্রায় ৫৫% পণ্যের ট্যারিফ ৫০% থেকে ১৮% করে হ্রাস করবে।
চুক্তি ঘোষণার পরেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায়। প্রথমত, ভারত কি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি সুবিধা পেয়েছে, নাকি সমান শর্তে সমঝোতা হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত, দিল্লি রাশিয়ান তেল ক্রয় বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কিনা, এবং পাঁচ বছরের মধ্যে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের যুক্তরাষ্ট্রীয় পণ্য কেনার লক্ষ্য বাস্তবায়নযোগ্য কি না, এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিততা নেই।
কৃষক ইউনিয়নগুলোও চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পণ্যের ট্যারিফ হ্রাসের ফলে দেশীয় উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপ বাড়বে বলে সতর্ক করেছে। বিশেষ করে দুগ্ধ এবং জেনেটিক্যালি মডিফাইড পণ্যের ওপর কোনো রিলিফ দেওয়া হয়নি, যা কৃষক সংস্থার উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রী পিয়ুশ গয়াল উল্লেখ করেছেন যে, ভারতীয় সরকার দুগ্ধ ও জিএম পণ্যের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়নি। এই অবস্থানটি চুক্তির সমতা বজায় রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে, বাজারে ট্যারিফ হ্রাসের ফলে কিছু পণ্যের রপ্তানি বাড়তে পারে, যা সামগ্রিক বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলবে।
বাণিজ্য আলোচনার স্থগিত হওয়া আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিকেন্দ্রিক শিল্পগুলো ট্যারিফের পরিবর্তন ও রায়ের পরিণতি নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করছে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতি পুনর্বিবেচনা করার সম্ভাবনা ভারতীয় রপ্তানির দিকনির্দেশনা পুনর্গঠন করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং ট্রাম্পের ট্যারিফ পরিকল্পনা দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়নের দরজা খুলে দিয়েছে। ইন্টারিম চুক্তির কিছু ধারা এখনও অনিশ্চিত থাকায়, উভয় পক্ষই পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য সতর্কতা অবলম্বন করছে। ভবিষ্যতে ট্যারিফের পরিবর্তন ও চুক্তির বাস্তবায়ন কিভাবে বাজারকে প্রভাবিত করবে, তা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।



