রাঙামাটি জেলার লংগদু গ্রামে শনিবার সকালে পাঁচজনের বেশি ব্যক্তি মালিকবিহীন কুকুরকে বাঁশের ফাঁদে আটকে, জোরে টেনে নৌকায় তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য রেকর্ড করা হয়েছে। অন্তত বিশটি কুকুরকে মাইনীর ঘাটে অবস্থিত বন বিভাগ সংলগ্ন ইঞ্জিনচালিত নৌকে লোড করা হয় এবং কুকুরগুলোকে কাপ্তাই লেকের কাট্টলি বিলের দিকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। শিকারের পেছনে মাংসের জন্য কুকুরকে হত্যা করার দাবি করা হয়েছে।
শিকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের পাংখোয়া জনগোষ্ঠীর সদস্য বলে দাবি করেন। একজন শিকারী জানান, তারা বরকল উপজেলা থেকে এসেছেন এবং কুকুরকে জবাই করে মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যে শিকার করা হয়েছে। শিকারের পর কুকুরগুলোকে বরকলের আলাম্বায় অবস্থিত পাংখোয়া গ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে বলে তারা বলছেন।
রাঙামাটি এলাকার একজন পাংখোয়া বাসিন্দা, নাম প্রকাশ না করে, উল্লেখ করেন যে শিকারীরা হয়তো আইন সম্পর্কে অবহিত নয়; তারা বিষয়টি সঠিকভাবে না বুঝে এমন কাজ করেছে বলে তিনি অনুমান করেন। স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে যে শিকারীদের সতর্ক করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে পুনরায় এধরনের কাজ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা রাকিবুল হক, যিনি স্থপতি পেশায় কাজ করেন, প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯ এর সাপেক্ষে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, ধারা ৭ অনুসারে মালিকবিহীন কুকুরের হত্যা বা অপসারণ অপরাধ এবং শাস্তিযোগ্য। কুকুরে রেবিসসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি থাকে; বেওয়ারিশ কুকুরের মাংস খেলে মানব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি হয়।
আইনের মূল উদ্দেশ্য হল রেবিস নির্মূলের জন্য কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি চালু করা। টিকাদান করা এলাকায় যদি কুকুরকে অপসারণ করা হয়, তবে সেই এলাকায় টিকাদানহীন কুকুর প্রবেশ করে রোগের ফাঁক তৈরি হয়। তাই আইনটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কুকুর অপসারণে বাধা দেয়, যাতে স্বেচ্ছাচারী শিকারের মাধ্যমে রোগের বিস্তার রোধ করা যায়।
শিকারের পেছনে দীর্ঘদিনের একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের কুকুরের মাংস খাওয়ার প্রথা রয়েছে। তবে এই প্রথা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ। স্থানীয় পুলিশ ও বন বিভাগকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে; শিকারীদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের পাশাপাশি কুকুরের অবৈধ শিকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রশাসনিক কর্মকর্তারা শিকারীদের পুনরায় সতর্ক করেছেন এবং জানিয়েছেন যে ভবিষ্যতে অনুরূপ কার্যকলাপের পুনরাবৃত্তি হলে কঠোর শাস্তি আরোপ করা হবে। এছাড়া, কুকুরের টিকাদান ও রেবিস নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থানীয় স্বাস্থ্য ও পশু সেবা বিভাগকে ত্বরান্বিত করে কাজ করতে বলা হয়েছে।
এই ঘটনার পর, রাঙামাটি জেলায় কুকুরের অবৈধ শিকারের ওপর তদারকি বাড়ানোর জন্য একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, কুকুরের শিকারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে রেবিসের বিস্তার রোধ করা এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সামগ্রিকভাবে, রাঙামাটিতে মালিকবিহীন কুকুর শিকারের ঘটনা স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রথা, আইনগত নিষেধাজ্ঞা এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের অবৈধ কার্যকলাপের পুনরাবৃত্তি রোধে আইন প্রয়োগের তীব্রতা বাড়বে এবং সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়কে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আইন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করা হবে।



