১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কাছাকাছি রাজপথে দশজন নারী একসাথে সেকশন ১৪৪ ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের মধ্যে প্রথম নারী ছিলেন তাহমিনা সালেহ, যিনি তখনই ২০ বছর বয়সের তরুণী ছিলেন। গ্যাস, গুলির শব্দ এবং রক্তাক্ত তরুণদের কণ্ঠস্বরের মাঝেও তারা অটলভাবে অগ্রসর হয়।
গ্যাসের শেল থেকে চোখ রক্ষা করতে তাহমিনা ও তার সাথীরা ওড়না ছিঁড়ে পানিতে ভিজিয়ে ব্যবহার করত। এই দৃশ্যই ভাষা আন্দোলনের রক্তিম স্মৃতিতে আজও অমলিন। যদিও তিনি এই অংশটি কখনো প্রকাশ্যে বলেননি, তবে সাম্প্রতিক স্মৃতিচারণা গ্রন্থে প্রথমবার বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
‘খেরোখাতাতে’ শিরোনামের স্মৃতিচারণা গ্রন্থটি তার পরিবারিক বন্ধুদের সাহায্যে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তার বানানীর বাসায় একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, যেখানে ৮৮ বছর বয়সী তাহমিনা তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো পুনরায় বর্ণনা করেন।
সাক্ষাৎকারে তিনি ১৯৫২ সালের ঘটনার পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কষ্টকর অভিজ্ঞতাও শেয়ার করেন। ২৫ মার্চের পর কাপ্তাই থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময়, ১৫ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনা প্রকৌশলী শামসুদ্দীনকে গ্রেফতার করে। শামসুদ্দীনকে গুলি করে হত্যা করার পর, তাহমিনার স্বামী এ কে সালেহকে দাঁড়িয়ে কলেমা উচ্চস্বরে পাঠ করতে বাধ্য করা হয়।
একজন মেজর ইশারার মাধ্যমে স্বামীকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, ফলে তাহমিনা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসেন। যুদ্ধের শেষের দিকে, ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিনেও তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যার খবর শোনার পর শোকাহত হন, ফলে উল্লাসের কোনো মুহূর্ত পাননি।
যুদ্ধের পর স্বামী এ কে সালেহ চাকরি ছেড়ে ঢাকা ফিরে ব্যবসা শুরু করেন। মোহাম্মদপুরে একটি বাড়ি নির্মাণের দায়িত্ব তিনি নিজেই তদারকি করেন, যেখানে তিনি নির্মাণের সব কাজের তদারকি করেন।
তাহমিনার তিন সন্তান—দুই ছেলে ও একটি মেয়ে—সবেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক হন এবং পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যান। বড় মেয়ে তাসনিম সালেহ আইবিএমে কর্মরত, বড় ছেলে ইশতিয়াক সালেহ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন, আর ছোট ছেলে আসিফ সালেহ ব্র্যাকের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বামী এ কে সালেহের স্বাস্থ্যের অবনতি ১৯৯০-এর দশকে শুরু হয়; তিনি ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হন, তবে দীর্ঘ সময় সুস্থ থেকেছেন। ২০০৩ সালে হেপাটাইটিস সি-র জটিলতা থেকে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তাহমিনা একা বেঁচে রইলেন, আট ভাইবোনের মধ্যে এখন কেবল তিনি বাকি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সামাজিক বন্ধনগুলোকে দূরত্বপূর্ণ মনে করেন, ‘সব দিগন্ত বন্ধ, কোনো বন্ধু নেই’ বলে প্রকাশ করেন। তবু তিনি জীবনের সৌন্দর্যকে স্বীকার করে, নিয়মিত ভোরে ওঠা, সরল খাবার, বই ও সঙ্গীতের সঙ্গে দিন কাটানোর অভ্যাস বজায় রাখেন।
তার জীবনের এই ধারাবাহিকতা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কঠিন সময়ে দৃঢ়সংকল্প ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে তিনি নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই ধরনের বাস্তব জীবনের গল্প অন্তর্ভুক্ত করা শিক্ষার্থীদের সামাজিক দায়িত্ববোধ ও ঐতিহাসিক সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
পাঠকরা যদি নিজের লক্ষ্য নির্ধারণে অনিশ্চিত হন, তবে তাহমিনার মতো করে ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করুন; নিয়মিত পড়াশোনা, স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদে সাফল্যের চাবিকাঠি।



