২১ ফেব্রুয়ারি শনিবার রাতভর পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ব্যাপক বোমা হামলা আফগানিস্তানের পক্তিকা ও নানগরহার প্রদেশে চালানো হয়। ধর্মীয় স্কুল, মসজিদ এবং বেসামরিক বাড়িগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যার ফলে অন্তত ৮০ জনের বেশি প্রাণ হারায়।
আফগান সরকারি সূত্র জানায়, হামলায় ধর্মীয় শিক্ষালয় এবং মসজিদে বিস্তৃত ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, যেখানে বহু পরিবার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা রাত্রিকালীন বোমাবর্ষণের পর ধোঁয়া ও ধুলোর মধ্যে আতঙ্কে ভুগছিলেন।
পাকিস্তান সরকার দাবি করে, এই আক্রমণ সীমান্তের কাছে অবস্থিত সাতটি জঙ্গি ক্যাম্প ও আস্তানা লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী শিবিরে লক্ষ্যবস্তুতে বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।
আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসন এই হামলাকে “উপযুক্ত” প্রতিক্রিয়া জানাতে হুমকি জানিয়ে থাকে এবং দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এখন অস্থির অবস্থায় রয়েছে। তালেবান নেতারা উল্লেখ করেছেন, যদি এই ধরনের আক্রমণ চালু থাকে তবে তারা শক্তিশালী সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।
পক্তিকায় একটি বেসামরিক বাড়িতে বোমা ফেলা হয়, যেখানে পরিবার প্রধান আব্দুল্লাহ জান জানান, মধ্যরাতে আকাশ থেকে বোমা নেমে এসে বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। তিনি বলেন, তৎকালীন সময়ে কোনো সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি ছিল না, তবে বোমা নিক্ষেপের অজুহাতে টিটিপি সদস্যদের উপস্থিতি উল্লেখ করা হয়।
অঞ্চলের গভর্নর মিরজা আলি খান সাঈদ জানান, বোমাবর্ষণের পর রাত ২টায় আবার অতিরিক্ত আক্রমণ চালানো হয়। তিনি উল্লেখ করেন, বাড়িতে কেউ থাকলেও সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং আশেপাশের বাড়ির বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করতে সাহায্য করেছে।
বার্মাল জেলায় একটি ধর্মীয় স্কুলেও বোমা নিক্ষেপ করা হয়, যেখানে শিশুরা ও নারীরা ভয়ভীত হয়ে গিয়েছিল। এক সাক্ষী মোহাম্মদ জুবায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, ধুলো‑ধোঁয়ার গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে ছিল এবং আশেপাশের বাড়ির মানুষ দ্রুত বেঁচে থাকা লোকদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই আক্রমণকে অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, “পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে ক্রমবর্ধমান আক্রমণীয়তা দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তিকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।”
ইউএন নিরাপত্তা পরিষদও এই ঘটনার পর দ্রুত একটি জরুরি সভা আহ্বান করার কথা বিবেচনা করছে। পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো দেশগুলোও পাকিস্তানের এই পদক্ষেপকে নিন্দা করে এবং আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
অঞ্চলীয় সংস্থা, যেমন শাংখাই সিকিউরিটি ডায়ালগ, ইতিমধ্যে দু’দেশের কূটনৈতিক চ্যানেল পুনরায় চালু করার প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে সীমান্তে অবৈধ আকাশীয় হামলা রোধ করা যায়। বিশ্লেষকরা আশা করেন, যদি দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনা না হয় তবে উভয় পক্ষের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়বে।
পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আবারও জোর দিয়ে বলেছে, তারা সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সন্ত্রাসী শিবিরে আক্রমণ চালিয়েছে এবং কোনো বেসামরিক লক্ষ্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করেনি। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এই দাবির বিপরীতে রেকর্ডেড সিভিলিয়ান ক্ষতি তুলে ধরছে।
আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসন শেষ পর্যন্ত একটি সতর্কতা জারি করেছে, যে ভবিষ্যতে এমন কোনো আক্রমণ পুনরাবৃত্তি হলে তারা “উপযুক্ত” সামরিক জবাব দেবে। এই বিবৃতি অঞ্চলের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে, কারণ এটি সম্ভাব্য বৃহত্তর সংঘর্ষের ইঙ্গিত দেয়।
এই ঘটনার পর, দু’দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে জরুরি আলোচনার সূচনা হয়েছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা পরস্পরের নিরাপত্তা উদ্বেগ সমাধানের জন্য একটি সাময়িক শীতলীকরণ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা, এই আলোচনাগুলো দ্রুত ফলাফল দেবে এবং অতিরিক্ত বেসামরিক ক্ষতি রোধ করবে।



