চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় হালিমা মঞ্জিলের দ্বিতীয় তলায় আজ প্রাতঃকালীন ৪:১৫ টার দিকে গ্যাস লিকের সন্দেহে বিস্ফোরণ ঘটায়, ফলে দুই পরিবারে মোট নয়জনের দেহে তীব্র পোড়া ও শ্বাসজনিত আঘাত হয়। ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙে এবং তৎক্ষণাৎ অগ্নি সেবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
বিস্ফোরণটি হালিমা মঞ্জিলের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত একটি ফ্ল্যাটে ঘটেছে, যেখানে সন্ধ্যাকালীন সময়ে কোনো প্রতিবেশী অস্বাভাবিক গন্ধ বা অশান্তি লক্ষ্য করেননি। গ্যাসের লিকের ফলে সঞ্চিত গ্যাসের বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে, তবে সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও তদন্তাধীন।
আহতদের মধ্যে রয়েছে ৪ বছর বয়সী আয়েশা, ৭ বছর বয়সী আনাস, ১০ বছর বয়সী উম্মায় অয়ন, ১৭ বছর বয়সী শাওন, ৩২ বছর বয়সী শিপন, ৪০ বছর বয়সী সুমন, ৪০ বছর বয়সী রানি, ৩৫ বছর বয়সী পাখি এবং ৪৬ বছর বয়সী শাকাওয়াত। তাদের বয়স ও সম্পর্কের ভিত্তিতে দুইটি পারিবারিক গোষ্ঠীকে এই দুঃখজনক ঘটনা প্রভাবিত করেছে। সকল রোগীই তীব্র দাহজনিত আঘাত ও শ্বাসনালীতে গ্যাসের প্রভাবের শিকার হয়েছে।
অগ্নিনির্বাপক দলে পাঁচটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, যেখানে প্রথমে অগ্নি নিয়ন্ত্রণের জন্য উচ্চ চাপের পানির জেট ও ফোম ব্যবহার করা হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর, ৫:৩০ টার দিকে অগ্নি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ধোঁয়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত ফ্ল্যাটের দেয়াল ও জানালার কাঁচ ভেঙে যাওয়া অবস্থাও নথিভুক্ত করে।
হালিশহর ফায়ার সার্ভিসের সীনিয়র স্টেশন অফিসার খলিলুর রহমান জানান, বিস্ফোরণের ফলে একই তলায় অবস্থিত দু’টি ফ্ল্যাটের কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে দেয়াল ভেঙে যাওয়া এবং জানালার কাঁচ ভাঙ্গা অন্তর্ভুক্ত। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অগ্নি নিয়ন্ত্রণের সময় কোনো অতিরিক্ত সিভিল ক্ষতি রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আহতদের দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্ণ ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। রোগীদের রেসকিউ অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়ার সময় অগ্নি সেবা ও হাসপাতাল কর্মীরা ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখে, যাতে সময়মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা যায়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ড. রফিকুল ইসলাম, বর্ণ ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধানের মতে, রোগীরা শ্বাসজনিত আঘাতের পাশাপাশি দেহের ২৫% থেকে ১০০% পর্যন্ত পোড়া পেয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু রোগীর শ্বাসনালীতে গ্যাসের প্রভাবের কারণে অক্সিজেন সাপ্লাই ও ভেন্টিলেটর সহায়তা প্রয়োজন। অন্যদিকে, অধিকাংশ রোগীর ত্বকে তীব্র দাহের চিহ্ন দেখা যায়, যা দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।
অগ্নি সেবার সূত্রে বলা হয়েছে, বিস্ফোরণের মূল কারণ গ্যাস লাইন থেকে লিক হওয়া গ্যাসের সঞ্চয় হতে পারে, তবে সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও তদন্তাধীন। গ্যাস লিকের উৎস নির্ণয়ের জন্য ফোরেনসিক বিশ্লেষণ ও লিকেজ টেস্ট করা হচ্ছে।
হালিশহর থানার তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলে ফরেনসিক পরীক্ষা চালিয়ে গ্যাস লিকের প্রকৃতি ও দায়িত্বশীল পক্ষ নির্ধারণের চেষ্টা করছে। তদন্তে গ্যাস পাইপের রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড, নির্মাণ অনুমতি ও পূর্ববর্তী নিরাপত্তা পরিদর্শনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
যদি গ্যাস লিকের দায়িত্ব কোনো নির্মাণ বা রক্ষণাবেক্ষণ সংস্থার উপর প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী অপরাধমূলক দায়িত্ব আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। গ্যাস নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, যা আইনি প্রক্রিয়ায় প্রয়োগ করা হবে।
অগ্নি সেবা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের গ্যাস সরঞ্জাম ব্যবহারের সময় সতর্কতা অবলম্বন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং অস্বাভাবিক গন্ধের ক্ষেত্রে তৎক্ষণাত্ জানাতে আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া, গ্যাস সংযোগের আগে অনুমোদিত টেকনিশিয়ান দ্বারা পরীক্ষা করানো এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে চলা জরুরি বলে জোর দেওয়া হয়েছে।
বিস্ফোরণটি স্থানীয় সম্প্রদায়কে শক করেছে, তবে দ্রুত সাড়া ও চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে আঘাতপ্রাপ্তদের জীবন রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে গ্যাস নিরাপত্তা নিয়মের কঠোর বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।



