কক্সবাজারের টেকনাফে ডিসেম্বর থেকে দেখা দিতে থাকা একটি বিশেষ আমের প্রকার, স্থানীয়ভাবে “বুক সেলাই” নামে পরিচিত, বর্তমানে ফেব্রুয়ারি শেষের দিকে পর্যন্ত বিক্রয় চলছে। রমজান মাসে রোজাদারদের উচ্চ চাহিদা এবং ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকার কেজি মূল্যের কারণে এই ফলের বিক্রয় দ্রুত বাড়ছে।
বুক সেলাই আমটি মাঝারি আকারের, এক পাশে লম্বা দাগযুক্ত এবং স্থানীয় মানুষ এটিকে “বুক সেলাই” বলে ডাকে। কৃষিবিদদের মতে, এটি বারোমাসি আমের একটি উপশ্রেণি, তবে দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে এই রকমের ফল দেখা যায় না।
টেকনাফের বিভিন্ন ফলের দোকানে ডিসেম্বর থেকে এই আমের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, এবং ফেব্রুয়ারি শেষের সপ্তাহেও দেদার বিক্রি চালু রয়েছে। রমজান মাসের পবিত্রতা ও উপবাসের সময় উচ্চ মূল্যে এই ফলের চাহিদা তীব্র হয়েছে।
প্রতি কেজি বিক্রয়মূল্য ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত স্থির, যা মৌসুমের বাইরে থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকদের আকৃষ্ট করছে। রমজানকালে উপবাস ভাঙার জন্য চড়া দামে এই ফলের চাহিদা বিশেষভাবে বেড়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন, এই আমটি স্থানীয় আর্দ্র পরিবেশে দ্রুত ফল দেয়, যদিও একই জাতের আম সারা দেশে বারোমাসি ফলন দেয়। স্থানীয় জলবায়ু এই প্রকারের আগাম ফলনকে সম্ভব করে তুলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
টেকনাফ বাসস্টেশন বাজারের “মামা-ভাগিনা” নামের ফলের দোকানটি এই আমের প্রধান বিক্রেতা। দোকানের মালিক মো. ইউনুস ও শাহ জাহান পাঁচ বছর ধরে কাঁচা আমসহ বিভিন্ন ফল বিক্রি করছেন এবং গত সাত দিনে স্থানীয় তিনটি এলাকায় থেকে প্রায় ১২ লক্ষ টাকার কাঁচা আম সংগ্রহ করেছেন।
এই সংগ্রহের বেশিরভাগই ঢাকায় সরবরাহ করা হয়েছে, যা দেশের মূল বাজারে টেকনাফের আমের প্রবেশের পথ খুলে দিয়েছে। ফলে ঢাকার রিটেইলারদের কাছে এই মৌসুমের বাইরে থাকা ফলের সরবরাহ সহজ হয়েছে।
টেকনাফ পৌরসভার রাস্তায় ফুটপাতে বসে বিক্রি করা বাদশা মিয়া নামের বিক্রেতা, আমকে বাঁশের সঙ্গে সুতায় বেঁধে ঝুলিয়ে বিক্রি করেন। গ্রাহকরা দরদাম করে দুই-তিনটি করে কিনে নেন এবং এই পদ্ধতি স্থানীয় ক্রেতা ও পর্যটকদের উভয়েরই মনোযোগ আকর্ষণ করে।
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে পর্যটকরা এই আগাম আমকে উচ্চ মূল্যে কিনে উপভোগ করছেন, যা স্থানীয় বিক্রেতাদের জন্য অতিরিক্ত আয় সৃষ্টি করছে। মৌসুমের বাইরে ফলের এই চাহিদা টেকনাফের ফলবাজারে নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করেছে।
দেশজুড়ে বারোমাসি কাটিমন জাতের আম সারা বছর ফল দেয়, তবে টেকনাফের বিশেষ জলবায়ু এই প্রজাতির আগাম ফলনকে সম্ভব করেছে। অন্যান্য অঞ্চলে একই ফলের আগাম উৎপাদন এখনও অর্জিত হয়নি, যা টেকনাফের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা।
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির উল্লেখ করেন, এই প্রকারের আগাম ফলনের পেছনে পরিবেশগত কারণের বিশদ গবেষণা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যদি এই বৈশিষ্ট্যটি বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করা যায়, তবে অন্যান্য অঞ্চলে অনুরূপ চাষের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সাবরাং ইউনিয়নের কৃষক দিল মোহাম্মদ জানুয়ারিতে ৭ লক্ষ টাকার কাঁচা আম বিক্রি করেছেন, প্রতি কেজি ৫৫০ টাকায়। তিনি ১৩ বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপে একই ধরনের আম দেখেছেন, যা তার মতে এই প্রজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করে।
বাজারে এই আগাম আমের প্রবেশ মূলত উচ্চ মূল্যে বিক্রয় এবং রমজান সময়ের চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে লাভজনকতা বাড়াচ্ছে। তবে মৌসুমের বাইরে ফলের স্থায়িত্ব, সরবরাহ শৃঙ্খলের নির্ভরযোগ্যতা এবং সম্ভাব্য মূল্য অস্থিরতা ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে গবেষণা ফলের উৎপাদন বাড়াতে এবং মূল্য স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে, যা টেকনাফের ফলবাজারকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করবে।



