ঢাকা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির তৃতীয় ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ডিজিটাল পণ্য ও সেবার জন্য কাস্টমস শুল্ক আরোপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে সফটওয়্যার ডাউনলোড, সঙ্গীত ও ভিডিও স্ট্রিমিং, ই-বুক, মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন গেমিং এবং ক্লাউড‑ভিত্তিক সেবা অন্তর্ভুক্ত।
চুক্তিতে বাংলাদেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ডিজিটাল পণ্যের ওপর শুল্কমুক্তির স্থায়ী বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করার বাধ্যবাধকতাও দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টি ১৪তম বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) মন্ত্রী সম্মেলনে, যা ২৬-২৯ মার্চ ক্যামেরুনে অনুষ্ঠিত হবে, পুনরায় আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকার বাণিজ্য কর্মকর্তারা জানান, এই শর্তগুলো দেশের ডিজিটাল সেক্টরের ট্যারিফ নীতি সীমাবদ্ধ করতে পারে। বিশেষ করে, শুল্কমুক্তির মোরাটোরিয়াম বজায় রাখলে সরকার ডিজিটাল সেবা থেকে সম্ভাব্য কর আয় হারাতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ডিজিটাল সেবার নিট আমদানিকারক হওয়ায় এই চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। তিনি বলেন, “আমাদের শুল্কমুক্তি মোরাটোরিয়াম বজায় রাখার কোনো স্বার্থ নেই,” এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোও এই মোরাটোরিয়াম তুলে দিয়ে রাজস্বের নতুন উৎস উন্মুক্ত করতে চায়।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হল, বাংলাদেশ ডিজিটাল সেবা কর (Digital Services Tax) প্রয়োগ করবে না, যা “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর প্রতি বৈষম্যপূর্ণ” হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় টেক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের থেকে অর্জিত বিক্রয় আয়ের ওপর স্থানীয় কর থেকে রেহাই পাবে।
প্রচলিত আন্তর্জাতিক কর বিধি অনুসারে, কোনো কোম্পানি শারীরিক উপস্থিতি (যেমন কারখানা বা সদর দপ্তর) না থাকলে সে দেশের করদাতা হিসেবে গণ্য হয় না। তবে আজকের বড় টেক ফার্মগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে ভিত্তিক হলেও, স্থানীয় অফিস না খুলেই বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের থেকে লক্ষ লক্ষ ডলার আয় করে।
এই পরিস্থিতি সরকারকে ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত বৃদ্ধি সত্ত্বেও করভিত্তি গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। শুল্কমুক্তি ও করমুক্তি বজায় রাখলে, ভবিষ্যতে ডিজিটাল সেবা থেকে সম্ভাব্য কর সংগ্রহের সুযোগ সীমিত হবে।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করেন, যদি বাংলাদেশ ডিজিটাল সেবা কর প্রয়োগ না করে, তবে আন্তর্জাতিক টেক জায়ান্টদের প্রতি অপ্রতিসম সুবিধা সৃষ্টি হবে, যা স্থানীয় স্টার্টআপ ও ছোট ব্যবসার প্রতিযোগিতায় অসুবিধা আনতে পারে।
অন্যদিকে, WTO-তে আলোচিত শুল্কমুক্তির বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা যদি গৃহীত হয়, তবে বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা কমে যাবে। এতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডিজিটাল পণ্যের দাম কমে, ভোক্তা ও ব্যবসা উভয়েরই উপকার হবে।
তবে, সরকারকে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, শুল্কমুক্তি বজায় রেখে ডিজিটাল সেবা কর না আরোপ করা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্বার্থে ক্ষতিকর হবে কি না। চুক্তির পর্যালোচনা প্রক্রিয়ায় এই বিষয়গুলো পুনরায় আলোচিত হতে পারে।
মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় তার স্বার্থ রক্ষার জন্য শুল্কমুক্তি মোরাটোরিয়াম তুলে দিয়ে ডিজিটাল সেবা করের কাঠামো গড়ে তোলা উচিত। এভাবে সরকার ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত বর্ধনকে উৎসাহিত করতে পারবে এবং একইসাথে করভিত্তি সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে।
সারসংক্ষেপে, নতুন বাণিজ্য চুক্তি ডিজিটাল পণ্যের শুল্কমুক্তি নিশ্চিত করেছে, তবে তা সরকারের কর সংগ্রহের সম্ভাবনা সীমিত করতে পারে। ভবিষ্যতে চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন ও WTO-তে আলোচনার ফলাফল দেশের ডিজিটাল নীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



