বিলবগ্রাম হাট, গৌরনদী উপজেলার প্রাচীনতম গ্রামীণ বাজার, ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (LGED) আর্থিক সহায়তায় নারীদের জন্য আলাদা একতলা মার্কেট গঠন করে স্বনির্ভরতা বাড়িয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে চারজন নারী কসমেটিক, তৈরি পোশাক, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ও বিউটি পার্লার পরিচালনা করছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বাজারের প্রবেশদ্বার থেকে দুই গলির মাঝখানে বিশাল একটি খোলা মাঠ দেখা যায়, যেখানে সামাজিক সমাবেশ, রাজনৈতিক সভা এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম গলিতে অবস্থিত নারীর মার্কেটের প্রতিটি কক্ষের মাসিক ভাড়া মাত্র পঞ্চাশ টাকা, যা স্থানীয় নারীদের জন্য স্বল্প মূলধনে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ দেয়।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক রেকা রানি দাস ও কসমেটিক ব্যবসা চালানো মিনু বেগমের মতো উদ্যোক্তারা এখানে রোগীর সেবা ও সৌন্দর্য পণ্য বিক্রির মাধ্যমে পরিবারিক আয় নিশ্চিত করছেন। তাদের ব্যবসা চালু হওয়ার পর থেকে স্থানীয় নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন শক্তিশালী হয়েছে।
বাজারের দক্ষিণ পাশে দুটি বড় শেডে সামুদ্রিক ও স্থানীয় পুকুরে চাষ করা মাছের বিক্রয় হয়। রুই, কাতল, মৃগেল, সিলভার কার্প, পাঙাশ, তেলাপিয়া, শোল, কই, শিং, মাগুর ইত্যাদি প্রজাতির তাজা মাছ সরাসরি বিক্রেতা থেকে ক্রেতা হাতে নেয়া হয় এবং ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করা হয়। এই মাছের সরবরাহ শৃঙ্খল গ্রামীণ কৃষক ও মাছ চাষীদের আয় বৃদ্ধি করে।
বাজারের কেন্দ্রে বিশাল অশ্বত্থ গাছের ছায়া নিচে অস্থায়ী সবজি ও ফলের স্টল বসে। লাউ, কুমড়া, শিম, বেগুন, মরিচ, শাকের পাতা ইত্যাদি স্থানীয় কৃষকদের নিজস্ব উৎপাদন থেকে সরাসরি বিক্রি হয়। অধিকাংশ বিক্রেতা নিজের ফসল নিয়ে আসে, ফলে মধ্যস্থতাকারীর খরচ কমে এবং গ্রাহককে সাশ্রয়ী মূল্যে তাজা পণ্য পাওয়া যায়।
বেলাল হোসেনের মতো ভাসমান সবজি বিক্রেতারা শনিবার ও মঙ্গলবার এই হাটে ভাসমান বাজার স্থাপন করেন, যা গ্রামবাসীর জন্য অতিরিক্ত ক্রয়-বিক্রয় সুযোগ সৃষ্টি করে। ভাসমান বাজারের উপস্থিতি স্থানীয় লজিস্টিক্সের উন্নতি ঘটায় এবং পণ্যের তাজা অবস্থায় পৌঁছানোর সময় কমায়।
বাজারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রবীণ বাসিন্দা মো. শাহজাহান মিয়া (৭৬) জানান, তিনি নিজের জন্মের পর থেকে এই হাটের পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন এবং গৌরনদী এলাকার অন্যতম প্রাচীন বাজার হিসেবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করেন। তিনি উল্লেখ করেন, হাটের মাছ ও ধানের চাহিদা দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছায়, যা স্থানীয় উৎপাদনকে জাতীয় স্তরে সংযুক্ত করে।
বিলবগ্রাম হাটের এই বহুমুখী কাঠামো—নারীর স্বাবলম্বী মার্কেট, মাছের শেড, অশ্বত্থ গাছের নিচের সবজি স্টল—গ্রামীণ ব্যবসার মডেল হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছে। সরকারী তহবিলের সঠিক ব্যবহার এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে বাজারের আয়তন ও বিক্রয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, নারীর স্বতন্ত্র ব্যবসা স্থানীয় পরিবারে আয় বৈচিত্র্য এনে দিচ্ছে, যা দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক। একই সঙ্গে, মাছের বাণিজ্য ও ভাসমান সবজি বাজারের সংযোজন সরবরাহ শৃঙ্খলকে সংহত করে, ফলে লজিস্টিক্স খরচ কমে এবং পণ্যের গুণগত মান বজায় থাকে।
ভবিষ্যতে, বাজারের অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের সংযোজনের মাধ্যমে লেনদেনের স্বচ্ছতা ও গতি বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া, নারীর উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও ক্রেডিট সুবিধা প্রদান করলে ব্যবসার স্কেল বাড়বে এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান আরও বৃদ্ধি পাবে।
সারসংক্ষেপে, বিলবগ্রাম হাটের সমন্বিত বাজার মডেল গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ, মাছের বাণিজ্য এবং স্থানীয় কৃষি পণ্যের সরাসরি বিক্রয়কে একসাথে উন্নত করছে। এই মডেলটি অন্যান্য গ্রামীণ এলাকায় পুনরায় প্রয়োগের জন্য একটি কার্যকর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।



