ঢাকার ধানমন্ডি ৭ নম্বর সড়কে বসবাসরত জাকিয়া রায়হানা গত চার দিন ধরে গ্যাসের সম্পূর্ণ অভাবে ভুগছেন। তার বাড়িতে তিতাসের গ্যাস সংযোগ থাকা সত্ত্বেও গ্যাস না পাওয়ায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সময়ে আশেপাশের বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাটেও গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
গ্যাসের এই ঘাটতি রমজান মাসে বাড়ির খাবার প্রস্তুতিতে বিশেষ বাধা সৃষ্টি করেছে। জাকিয়া উল্লেখ করেন, চার দিনের ধারাবাহিক গ্যাসবিহীন অবস্থায় পরিবারের দৈনন্দিন কাজকর্মে বড় ধরনের কষ্ট হচ্ছে। তার কথায় স্পষ্ট যে, গ্যাসের অভাব দীর্ঘমেয়াদে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে।
গ্যাস সংকটের ইতিহাস প্রায় এক দশক দশেরও বেশি সময়ের, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্রতর হয়েছে। গ্যাসের দাম বারবার বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং সরকারী স্তরে আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনা গৃহীত হলেও তা অর্থনৈতিক ভারে অতিরিক্ত চাপ যোগ করেছে। দেশের ঋণবহুল অবস্থায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহের ঘাটতি একসাথে দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গ্যাসের ব্যবহার কেবল গৃহস্থালি রান্নায় সীমাবদ্ধ নয়; শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার ও সিএনজি ইত্যাদি খাতে এর অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, যা দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। শিল্পখাতে গ্যাসের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে ক্যাপটিভ প্ল্যান্টগুলোতে।
শক্তি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নতুন সরকারের জন্য গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরবরাহের ঘাটতি অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়বে এবং শিল্পখাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে। এ পরিস্থিতি বিএনপি সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্যের অর্জনেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বিএনপি সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা বর্তমানে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। গ্যাসের ঘাটতি এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ শিল্প ও শক্তি খাতের উৎপাদনশীলতা সরাসরি গ্যাসের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
জাতীয় গ্যাস চাহিদা মোট ৩৮০ কোটি ঘনফুট প্রতি দিন, যেখানে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে ২৬৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। ফলে দৈনিক ১১৫ কোটি ঘনফুটের ঘাটতি রয়ে যায়, যা গৃহস্থালি, শিল্প ও পরিবহন খাতে গ্যাস সংকটের মূল কারণ।
পেট্রোবাংলা প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের ১১ শতাংশ গৃহস্থালি রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার সর্বোচ্চ ৪১ শতাংশ, শিল্পখাতে ৩৬ শতাংশ, সার উৎপাদনে ৬ শতাংশ, সিএনজি খাতে ৫ শতাংশ এবং চা শিল্পে ১ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হয়। এই পরিসংখ্যান গ্যাসের বহুমুখী গুরুত্বকে তুলে ধরে।
সরকার গ্যাসের চাহিদা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিদ্যুৎ ও সার খাতে সরবরাহ কমিয়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ভাগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনগুলো বন্ধ করে গ্যাসের চাহিদা হ্রাস করা হচ্ছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সিএনজি স্টেশন বন্ধের সময় তিন ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ছয় ঘণ্টা করা হয়েছে, তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের ঘাটতি এখনও বিদ্যমান।
১২ ফেব্রুয়ারি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের অংশ হিসেবে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা হয়। এই পদক্ষেপ সাময়িকভাবে সরবরাহের ফাঁক পূরণে সহায়তা করেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো ও অবকাঠামো উন্নয়ন অপরিহার্য।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, গ্যাসের ঘাটতি অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ ঘাটতি, শিল্প উৎপাদনের হ্রাস এবং মূল্যস্ফীতি তীব্র হবে। তাই সরকারকে গ্যাসের দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আমদানি নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না হলে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে বড় বাধা তৈরি হবে।



