তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ দেশে ফিরে, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করেন, যখন বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বসম্মত জয়লাভ করে। তারেকের পুনরায় ক্ষমতায় আসা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন মোড় এনে দেয়।
ইতিহাসে বহু নেতা নির্বাসন বা কারাবাসের পর দেশে ফিরে শীর্ষ ক্ষমতা ধারণ করেছেন। ইরানের রুহুল্লাহ খামেনি ১৯৭৯ সালে দীর্ঘ নির্বাসনের পর ইসলামি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়ে সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হন। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর কারাবাসের পর মুক্তি পেয়ে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পাকিস্তানে নওয়াজ শরিফ সামরিক শাসনামলে নির্বাসন থেকে ফিরে আবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এসব উদাহরণ দেখায় যে রাজনৈতিক দমন-নির্যাতন শেষ নয়, বরং প্রত্যাবর্তনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমানের গল্প বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া (বিএনপি চেয়ারপার্সন) এর জ্যেষ্ঠ সন্তান। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তিনি ও কয়েকজন শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার হন। হেফাজতে থাকা সময়ে নির্যাতনের অভিযোগ উঠে, এবং ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান।
লন্ডনে প্রায় সতেরো বছর কাটিয়ে তারেকের পরিবার ও রাজনৈতিক দলকে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা অনুভব করতে হয়। একই সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বাড়তে থাকে, ফলে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলের বহু নেতা ও কর্মী দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই প্রেক্ষাপটে ৫ আগস্ট ২০২৪-এ ছাত্র-জনতা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ে, যা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে নিয়ে যায়। শেহর হাসিনা, যিনি বহু মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি, ভারতীয় সীমান্তে আশ্রয় নেন।
সরকারের পতনের পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজনৈতিক শূন্যতা দেখা দেয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী একের পর এক দেশে ফিরে আসেন, যা দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সূচনা করে। এই ধারাবাহিকতায় ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ তারেক রহমানও দেশে ফিরে আসেন। তার ফিরে আসা বিএনপি ও তার সমর্থকদের মধ্যে বড় উৎসাহের সঞ্চার করে।
বিএনপি ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। ভোটের ফলাফল অনুযায়ী দলটি পরিষদে সর্বোচ্চ সিট অর্জন করে, যা তারেকের নেতৃত্বে সরকারের গঠনকে সম্ভব করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, ফলে তিনি দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক অবস্থানে অধিষ্ঠিত হন।
বিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু বিশ্লেষক ও বিরোধী দল তারেকের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা উল্লেখ করেন যে দীর্ঘ সময়ের নির্বাসন ও বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে তার বাস্তব জ্ঞান সীমিত হতে পারে। তদুপরি, শাসনকালে মানবাধিকার ও স্বাধীনতার অবস্থা কীভাবে থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তবে তারেকের সমর্থকরা জোর দিয়ে বলেন যে তার অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক ঐতিহ্য দেশের স্বার্থে কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের পর দেশের নীতি-নির্ধারণে বেশ কয়েকটি মূল দিকের পরিবর্তন প্রত্যাশিত। প্রথমত, দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাসনের পর দেশে শাসন পুনর্গঠনের জন্য আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার চালু হতে পারে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পূর্বে বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখা দেশগুলো সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক সংলাপের সম্ভাবনা দেখা যাবে। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতি, বিশেষ করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন উদ্যোগের প্রত্যাশা রয়েছে।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন যে, একক পার্টির অতিরিক্ত ক্ষমতা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই সংসদীয় তদারকি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিরোধী দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে, জনগণের প্রত্যাশা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকারকে ন্যায়সঙ্গত নীতি গ্রহণে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
সারসংক্ষেপে, তারেক রহমানের দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী পদ গ্রহণ এবং বিএনপি’র নির্বাচনী জয় দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। তার শাসনকাল কীভাবে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে। তবে স্পষ্ট যে, নির্বাসন থেকে ফিরে শীর্ষ ক্ষমতা গ্রহণের এই উদাহরণ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে রেকর্ড হবে।



