সালেহউদ্দিন আহমেদ, যিনি সাময়িক সরকারে দেড় বছর অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে বিদায় নেন, সরকারী কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রস্তাব করেছেন। তিনি ২৯ পৃষ্ঠার একটি উত্তরাধিকার নোটে মূল্যস্ফীতি ও বাস্তব আয়ের হ্রাসের প্রেক্ষাপটে পে স্কেল পরিবর্তনের জরুরি প্রয়োজন উল্লেখ করেছেন। নোটটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে এবং নতুন সরকারের নীতি নির্ধারণে ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
নোটে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত এক দশকের বেশি সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ১১১ শতাংশে পৌঁছেছে, যার ফলে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বাস্তব আয় হ্রাসের ফলে কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন না করলে বেতন ও মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে ফাঁক বাড়তে থাকবে।
সালেহউদ্দিন আহমেদ এই নোটে শুধুমাত্র বেতন কাঠামো নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতি, ব্যাংকিং সংস্কার এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও বিশদ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, আর্থিক খাতের সংস্কার ছাড়া বেতন বৃদ্ধি টেকসই হবে না। নোটে অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের কাজের ক্ষেত্র ও অগ্রাধিকারগুলোও স্পষ্ট করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংককে একই সঙ্গে মুদ্রানীতি নির্ধারণ ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের তদারকি করার দায়িত্বে দেখিয়ে তিনি স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন। এই দ্বৈত ভূমিকা প্রতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কমিয়ে দেয় বলে তিনি সতর্ক করেছেন। ফলে, মুদ্রানীতি ও তদারকি কার্যক্রমকে পৃথক করা প্রয়োজন বলে তিনি সুপারিশ করেন।
প্রস্তাবিত সংস্কার পরিকল্পনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম’ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংক তদারকি আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন অন্তর্ভুক্ত। এই নতুন সংস্থা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তদারকি, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিয়মাবলী প্রয়োগে বিশেষায়িত হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে নীতি অনুমোদন করলে এফআইডি দ্রুত একটি ধারণাপত্র প্রস্তুত করতে পারবে।
এফআইডি থেকে আলাদা ব্যাংক রেজল্যুশন কর্তৃপক্ষ, আমানত সুরক্ষা কর্পোরেশন এবং ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জন্য পৃথক আইন প্রণয়নের পরামর্শও নোটে দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থা আর্থিক সিস্টেমের স্থিতিশীলতা ও গ্রাহক সুরক্ষা বাড়াবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এছাড়া, উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্পে তহবিলের সঠিক বরাদ্দের জন্য তহবিল সংগ্রহের দক্ষতা বাড়াতে হবে।
সালেহউদ্দিন আহমেদ আর্থিক নীতি ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বজায় রাখা, রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদের বিদেশি ঋণ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আর্থিক স্বনির্ভরতা ও টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনা। এই নীতি অনুসরণ করলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক কল্যাণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নের পথে অগ্রসর হওয়ার সূচনা করেছিল। নতুন পে স্কেল এবং আর্থিক সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে, সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। এই পদক্ষেপগুলো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।



