দেড় বছর আগে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, চার দিন পরই সরকারপ্রধানের দায়িত্ব হস্তান্তরের পর রবিবার ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত গ্রামীণ টেলিকম ভবনের ইউনূস সেন্টারে ফিরে আসেন। তিনি মিরপুরের টেলিকম ভবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো সহকর্মীদের দ্বারা ফুলের বরণে স্বাগত পান, যা তার দীর্ঘদিনের কর্মজীবনের স্মরণীয় মুহূর্তকে চিহ্নিত করে।
সেই সকালেই ইউনূস সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপদেষ্টা এবং গ্রামীণ ব্যাংকের সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে একত্রে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের বর্তমান কৌশল, দারিদ্র্য বিমোচনায় নতুন উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেন। তার উপস্থিতি সংস্থার কর্মীদের জন্য উৎসাহের স্রোত তৈরি করে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
অধ্যাপক ইউনূস ২০০৬ সালে শান্তি ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন, যা গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে প্রদান করা হয়। নোবেল পুরস্কার তার সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করেছে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের মডেলকে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত করেছে। এই সাফল্য তার ফিরে আসার সময়ে পুনরায় উল্লেখ করা হয়, যা তার কাজের ধারাবাহিকতা ও প্রভাবকে তুলে ধরে।
জুলাই ২০২৩-এ ঘটিত অভ্যুত্থানের পর, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ফলে দেশের শাসন কাঠামো পরিবর্তিত হয়। ঐ সময়ে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যা দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার দায়িত্বে নিযুক্ত হয়। তিনি ফ্রান্স থেকে ফিরে ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং দেশের শাসন ব্যবস্থায় সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেন।
শপথ গ্রহণের সময় ইউনূস উল্লেখ করেন, যদিও তার ইচ্ছা না থাকলেও অভ্যুত্থানের পর তরুণ নেতাদের চাপে তাকে এই দায়িত্ব নিতে হয়। তিনি স্বীকার করেন যে তিনি কোনো রাজনৈতিক নেতা নন, বরং তার পেশাগত দক্ষতা ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এই বক্তব্য তার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও নীতি-নির্ভর নেতৃত্বের ইচ্ছা প্রকাশ করে।
২৪ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি আবার জোর দিয়ে বলেন, “আমরা কেউ দেশ শাসনের মানুষ নই। আমাদের নিজ নিজ পেশায় আমরা আনন্দ পাই। দেশের সংকটকালে ছাত্রদের আহ্বানে আমরা এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।” এই উক্তি তার স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধকে তুলে ধরে, যা জনমতকে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অন্তর্বর্তী সরকার তার মেয়াদে শাসনব্যবস্থার সংস্কার, নির্বাচন প্রস্তুতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়, যার ফলাফল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করে, ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় এবং ইউনূস রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ছেড়ে যান।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষের পর ইউনূসের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা থেকে বেরিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়। তার বিদায়ের সময় তিনি দেশের ভবিষ্যৎ নীতি গঠনে অবদান রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যদিও তিনি এখন আবার তার মূল কাজের দিকে ফিরে গেছেন।
ইউনূস সেন্টারে ফিরে এসে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের সহযোগী সংস্থার সঙ্গে কৌশলগত পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করেন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের নতুন প্রকল্পের সূচনা করেন। তার উপস্থিতি গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণা এবং আন্তর্জাতিক দাতাদের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ইউনূসের পুনরায় কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসা দেশের নীতি-নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে সামাজিক উদ্যোক্তা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে। যদিও তিনি সরাসরি রাজনৈতিক পদে নেই, তার মতামত ও পরামর্শ সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই মনোযোগ আকর্ষণ করে।
ভবিষ্যতে ইউনূস সেন্টারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগাবে। তার ফিরে আসা দেশের নীতি-নির্ধারণে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, যেখানে বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার একসঙ্গে সমন্বিত হবে।
সারসংক্ষেপে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মিরপুরের ইউনূস সেন্টারে ফিরে আসা তার দীর্ঘকালীন সামাজিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতা এবং দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে তার প্রভাবের পুনঃপ্রতিফলন। তিনি এখন আবার তার মূল মিশনে মনোনিবেশ করে, গ্রামীণ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে প্রস্তুত।



