ঢাকা, ২২ ফেব্রুয়ারি—চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন আজ সচিবালয়ের সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন যে চীন তিস্তা প্রকল্পে কাজ শুরু করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সরকার চাইলেই চীন তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করতে পারে। এই মন্তব্য তিস্তা নদীর ওপর চলমান যৌথ অবকাঠামো প্রকল্পের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
ইয়াও ওয়েনের মতে, চীন কোনো তৃতীয় দেশের হস্তক্ষেপ ছাড়া সরাসরি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ চীন স্বীকার করবে না। এই অবস্থান চীনের কূটনৈতিক নীতি ও স্বার্থ রক্ষার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
চীনা রাষ্ট্রদূত আরও জানান, তিস্তা প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুধুমাত্র দুই দেশের পারস্পরিক চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি বাংলাদেশ সরকার প্রকল্পের সূচনা চায়, তবে চীন তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। এভাবে প্রকল্পের সময়সূচি ও খরচের দিক থেকে কোনো বিলম্বের সম্ভাবনা কমে যাবে।
ইয়াও ওয়েনের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিস্তা প্রকল্পে চীন ও বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সহযোগিতা উভয় দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে। তদুপরি, প্রকল্পের সফলতা উভয় দেশের জনগণের জন্য সরাসরি উপকার বয়ে আনবে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রকাশিত হয়নি, তবে চীনের প্রস্তুতি জানার পর সরকারী কর্মকর্তারা প্রকল্পের সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি নিয়ে বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিস্তা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিক থেকে প্রকল্পটি কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। তাই সরকারী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা এখনই কেন্দ্রীয় বিষয়।
কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে তিস্তা প্রকল্প চীনের দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। চীন এ অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে তার অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চায়, এবং তিস্তা প্রকল্প এ পরিকল্পনার অংশ। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারকে চীনের প্রস্তাবের সঙ্গে সমন্বয় করে নীতি নির্ধারণ করতে হবে।
অঞ্চলীয় দৃষ্টিতে তিস্তা প্রকল্পের সফলতা ভারত-চীন-বাংলাদেশ ত্রিপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। চীন তৃতীয় দেশের হস্তক্ষেপ না চাওয়ার কথা বললেও, প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময়ে অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্বার্থের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার জটিলতা বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে সৃষ্ট বিদ্যুৎ ও সেচ সুবিধা কৃষি উৎপাদন বাড়াবে, যা দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। চীনের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের খরচ কমাতে এবং সময়সীমা সংক্ষিপ্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও শিল্প বিকাশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
রাজনৈতিকভাবে, চীনের এই প্রস্তুতি বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সরকার যদি চীনের প্রস্তাব গ্রহণ করে, তবে তা দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে পুনর্গঠন করতে পারে এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে শক্তিশালী করবে। তবে একই সঙ্গে, অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
পরবর্তী ধাপে, বাংলাদেশ সরকারকে তিস্তা প্রকল্পের বিশদ পরিকল্পনা, আর্থিক শর্তাবলী এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চীনের প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যে প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দিক ও সম্ভাব্য সময়সূচি উপস্থাপন করেছেন, যা সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। সরকারী অনুমোদন পাওয়া মাত্রই প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, ইয়াও ওয়েনের বক্তব্য চীনের তিস্তা প্রকল্পে কাজের প্রস্তুতি এবং তৃতীয় দেশের হস্তক্ষেপ না চাওয়ার স্পষ্ট নীতি প্রকাশ করে। বাংলাদেশ সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রকল্পের সূচনা নির্ধারণ করবে, এবং উভয় দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন পর্যায়ের সূচনা হতে পারে। এই উন্নয়ন দেশের অবকাঠামো, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।



