ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. সাব্বির ফয়েজ রোববার তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী ইকরাম হোসেন মোল্লা হত্যার মামলায় দুই সন্দেহভাজনকে মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা আরোপ করেন। রায়ের মধ্যে এক অভিযুক্ত শান্ত মিয়া পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়, আর অন্য অভিযুক্ত আবু সিদ্দিককে আদালতে হাজির করে সাজা পরোয়ানা দেওয়া হয়।
ইকরাম ও তার দুই বন্ধুর মধ্যে আর্থিক চুক্তি ছিল; ইকরাম বন্ধুকে ইট‑বালু ব্যবসার অংশ হিসেবে দুই লাখ টাকা দেন এবং মাসিক হাত‑খরচা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে ইকরাম কোনো হাত‑খরচা না পেয়ে, বন্ধুরা ব্যবসার পুঁজি শেষ করে ফেলতে শুরু করে।
অর্থের ঘাটতি এবং বন্ধুর মাদকাসক্তির খবর ইকরামের পরিবারে পৌঁছালে, শান্ত মিয়া ইকরামের ওপর রাগান্বিত হন। এ কারণে দুই বন্ধুর মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত শান্ত মিয়া আর আরেকজন বন্ধু আবু সিদ্দিককে সঙ্গে নিয়ে ইকরামকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন।
৪ মে ২০২৩ তারিখে ইকরাম নিজের বাসা থেকে বেরিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরিবার ও বন্ধুদের অনুসন্ধানে কোনো ফল না পেয়ে, ৫ মে খিলক্ষেত থানা সাধারণ ডায়েরি করে। পরের দিন, ৬ মে, খিলক্ষেতের পাতিরা বালু মাঠে ইকরামের মৃতদেহ পাওয়া যায়।
মৃতদেহের উদ্ধার পরই মৃতের পিতা কবির হোসেন মোল্লা খিলক্ষেত থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্তের ফলস্বরূপ, ২৬ নভেম্বর ২০২৩-এ থানা পরিদর্শক এনামুল হক খন্দকার দুজন সন্দেহভাজনের নাম আদালতে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করেন।
বিচার প্রক্রিয়া ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ শুরু হয়। আদালত মোট ২৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে, যার মধ্যে পরিবার, প্রতিবেশী ও তদন্তকারী কর্মকর্তার বিবৃতি অন্তর্ভুক্ত। প্রমাণের ভিত্তিতে শিকারের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন, মাদকদ্রব্যের ব্যবহার এবং হত্যার পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়।
বিচার শেষে, জজ মো. সাব্বির ফয়েজ শিকারের বন্ধু শান্ত মিয়া ও তার সহকারী আবু সিদ্দিককে মৃত্যুদণ্ড দেন। এছাড়া, হত্যার দায়ে দুইজনকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা এবং অপরিশোধিত জরিমানা পরিশোধে অতিরিক্ত তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড আরোপ করা হয়।
শান্ত মিয়া পলাতক হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং তাকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি অনুসন্ধান তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, আবু সিদ্দিককে আদালতে উপস্থিত করা হয় এবং রায়ের পর সঙ্গে সঙ্গে কারাগারে পাঠানো হয়।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, রায়ের পর সংশ্লিষ্ট পক্ষের আপিলের অধিকার রয়েছে এবং উচ্চতর আদালতে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যেতে পারে। তবে বর্তমান পর্যায়ে, শাস্তি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান।
এই মামলায় আদালত আর্থিক বিরোধ, মাদকদ্রব্যের প্রভাব এবং বন্ধুত্বের ভাঙনের ফলে সৃষ্ট হিংসা কীভাবে অপরাধে রূপান্তরিত হয় তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে আর্থিক চুক্তি ও মাদক সমস্যার যথাযথ সমাধান অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে, তেজগাঁও কলেজের ছাত্রের হত্যার মামলায় দ্রুত তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং ন্যায়বিচার প্রদান করা হয়েছে। রায়ের বাস্তবায়ন ও সম্ভাব্য আপিল প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে শিকারের পরিবার ও সমাজের ন্যায়বোধ পুনরুদ্ধার হয়।



