ইসরায়েলি কনেসেটের সদস্যরা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য একটি নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাবনা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে। এই বিলের লক্ষ্য হল শাস্তি ঘোষিত ৯০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ না দিয়ে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড সম্পন্ন করা। মানবাধিকার সংস্থাগুলি এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ২০২২ সালের জোট সরকার গঠনের শর্ত হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন‑গভির দাবি অন্তর্ভুক্ত করে এই বিধানকে বাধ্যতামূলক করে তোলার কথা প্রকাশ করে। বিলটি প্রথম পাঠে নভেম্বর মাসে পার্লামেন্টে অনুমোদিত হয় এবং জানুয়ারি মাসে এর মূল ধারা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়। এতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হলে ৯০ দিনের মধ্যে কোনো আপিল ছাড়াই ফাঁসির মাধ্যমে শাস্তি কার্যকর করা হবে।
ফিলিস্তিনি বন্দিদের অবস্থানকে “বন্দি” নয়, “যুদ্ধবন্দি” বলা অধিক যুক্তিযুক্ত বলে কিছু বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, কারণ তারা প্রায়শই কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে আটক থাকে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী ইসরায়েলি কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের এক তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক আটক অবস্থায় রয়েছে, যার মধ্যে নারী ও শিশুরাও অন্তর্ভুক্ত। এসব বন্দির বিচার সামরিক আদালতে হয়, যা থেকে পক্ষপাতের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে ইসরায়েলি কারাগারে নির্যাতন, অনাহার এবং চিকিৎসা সেবার অবহেলা বাড়ার অভিযোগ উঠে। এই সময়কালে অন্তত ৮৮ জন ফিলিস্তিনি বন্দি মৃত্যুবরণ করেছে বলে রেকর্ড রয়েছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন যে, শারীরিক নির্যাতন এবং মানসিক চাপের মাত্রা পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফিলিস্তিনি লেখক মোহাম্মদ আল‑কিক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, দশ বছর আগে তিনি কোনো স্পষ্ট অভিযোগ ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে আটক ছিলেন এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অনুমতি পাননি, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, ফিলিস্তিনিদের উপর এই ধারাবাহিক নিপীড়ন জেনেভা কনভেনশনের মৌলিক নীতির সরাসরি লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কিছু অংশ ইসরায়েলকে সন্ত্রাসবাদ দমন করার যুক্তি দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো উপেক্ষা করার অভিযোগ তুলেছে। তবে ইসরায়েলি সরকার নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার জন্য কঠোর শাস্তি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলছে যে, এই পদক্ষেপ গৃহস্থালি ও সীমান্তে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের প্রতিরোধে সহায়ক হবে।
বিলটি যদি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়, তবে পূর্বে ঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রেও শাস্তি কার্যকর করার সম্ভাবনা থাকে, যা হাজার হাজার বন্দির জীবনে সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করবে। এই পরিস্থিতি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে চলমান শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর অতিরিক্ত চাপ বাড়াতে পারে এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে।
আসন্ন সপ্তাহে কনেসেটের ভোটের ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিক্রিয়া দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন। যদি আইনটি পাস হয়, তবে মানবাধিকার সংস্থা এবং বেশ কয়েকটি দেশ আইনি চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে বিরোধিতা করতে পারে, যা ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক ফোরামে কঠিন অবস্থানে ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ডের এই প্রস্তাবনা ইসরায়েলি নিরাপত্তা নীতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের মধ্যে তীব্র সংঘাতের সূচনা করেছে। ভবিষ্যতে কীভাবে এই আইনটি গৃহীত হবে এবং তার পরিণতি কী হবে, তা দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল থাকবে।



