মৌলভীবাজারের একটি চা বাগানে বসবাসরত দুই বোন, ভেরোনিকা ও খ্রিস্টিনা কেরকেটা, তাদের ছোট নৃগোষ্ঠীর ভাষা খাড়িয়ার শেষ দুই সক্রিয় বক্তা হিসেবে পরিচিত। বাগানের গাছের ছায়ায় তাদের দৈনন্দিন কথোপকথনই এখন একমাত্র জীবিত রেকর্ড, আর তাদের কণ্ঠের নিঃশব্দে শেষ হলে ভাষাটিও চিরতরে নিস্তব্ধ হবে।
বোন দুজনের বয়স ত্রিশের শেষের দিকে, তবে শারীরিক দুরবস্থার কারণে তারা প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। যখনই মিলিত হন, তারা স্বাভাবিকভাবেই খাড়িয়া ভাষায় কথা বলেন, কারণ অন্য কেউ এই ভাষা জানে না। তাদের ছোট বোন খ্রিস্টিনা ছাড়া গ্রামে আর কোনো ব্যক্তি খাড়িয়া বলতে বা বুঝতে পারে না, ফলে বোনদের আলাপের মুহূর্তই ভাষার একমাত্র জীবন্ত অংশ।
ভেরোনিকা প্রকাশ করেছেন যে, তিনি নিজের ভাষায় কথা বলতে ইচ্ছুক, তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ কমে যায়। তিনি উল্লেখ করেন, গ্রামে অন্যরা প্রায়ই খাড়িয়া ভাষাকে উড়িয়া বা চা বাগানের অন্যান্য ভাষার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন, ফলে সামাজিক মঞ্চে বাংলায় কথা বলা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিবেশে তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা খাড়িয়া ভাষা শোনার পর হাসি-ঠাট্টা করে, বাংলা ভাষা পছন্দের কথা জানায়।
বোন দুজনের শৈশবে মা-বাবার মুখে মুখে ভাষা শিখে বড় হওয়া সত্ত্বেও, আজকের দিনে তাদের মধ্যে কথোপকথনের বাইরে আর কেউ এই ভাষা শিখতে পারছে না। চা বাগানের বহুভাষিক পরিবেশে বড় হওয়া নতুন প্রজন্মের জন্য খাড়িয়া ভাষা আর প্রাসঙ্গিক নয়, ফলে তা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
খ্রিস্টিনা জানান, তারা দুজনই কেবল একে অপরের সঙ্গে কথা বলার সময়ই খাড়িয়া ব্যবহার করেন; পরিবারের অন্য কেউ এই ভাষা জানে না। যদিও একই বাগানের পাশে অন্য একটি কলোনিতে অন্য পরিবার বসবাস করে, তবু দুজন বোনের অবসর সময়ে একত্রে বসে পুরনো স্মৃতি, গল্প ও ভাষার শব্দগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়। পরিবারকে ভাষা শেখানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ভাষা আর ব্যবহারযোগ্য নয়।
ভাষাবিদরা জোর দিয়ে বলেন, কোনো ভাষা কেবল যোগাযোগের উপায় নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও জীবনধারার বহনকারী। তাই ভেরোনিকা ও খ্রিস্টিনার কাহিনী কেবল দুই বোনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং একটি ভাষা হারানোর নীরব ট্র্যাজেডি।
শিক্ষা ক্ষেত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ভাষা সংরক্ষণে স্থানীয় বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অপরিহার্য। যদিও বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমে খাড়িয়া ভাষা অন্তর্ভুক্ত নয়, তবু স্থানীয় শিক্ষকদের উদ্যোগে ছোট গ্রুপে মৌলিক শব্দ ও বাক্য শেখানো সম্ভব হতে পারে। এমন উদ্যোগের মাধ্যমে ভাষার মৌলিক কাঠামো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।
বোন দুজনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় যে, ভাষা সংরক্ষণে পরিবারিক পরিবেশের পাশাপাশি সম্প্রদায়ের সমর্থন জরুরি। যদি স্থানীয় সমাজের সদস্যরা ভাষা শিখতে ইচ্ছুক হন, তবে ছোট কর্মশালা, গল্পের সন্ধ্যা বা মৌখিক ঐতিহ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ভাষার ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব।
অবশেষে, পাঠকদের জন্য একটি ব্যবহারিক প্রশ্ন রাখা যায়: আপনার আশেপাশে যদি কোনো ক্ষুদ্র ভাষা বা উপভাষা থাকে, আপনি কীভাবে তা সংরক্ষণে অবদান রাখতে পারেন? ছোট পদক্ষেপ, যেমন স্থানীয় শিশুদের সঙ্গে কিছু শব্দ শেয়ার করা, ভবিষ্যতে ঐ ভাষার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।



