সাম্প্রতিক সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সীমান্তে তীব্র নজরদারি এবং দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসার নতুন রূপ ধরতে সক্ষম হয়েছে। প্রধানত ভেজাল রাসায়নিক ব্যবহার করে তৈরি সিনথেটিক মাদক এবং ভেপ ই-সিগারেটের মধ্যে গোপনে লুকিয়ে রাখা এমডিএমবি (MDMB) প্রথমবারের মতো জব্দ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের পেছনে বড় চালান ধরা পড়ার ফলে ডিলারদের উৎপাদন পদ্ধতি পরিবর্তন করে স্বল্প পরিসরে নিজস্বভাবে মাদক তৈরি করার প্রবণতা রয়েছে।
বৈধ সীমান্ত পারাপার কঠোর নজরদারির পরেও মাদক ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে; তবে এখন ডিলাররা বিদেশি বড় চালানের বদলে দেশীয়ভাবে ভেজাল উপাদান মিশিয়ে নিজস্ব উৎপাদনে ঝুঁকি নিচ্ছেন। ডিএনসি সূত্রে জানানো হয়েছে যে, সম্প্রতি জব্দ হওয়া বেশিরভাগ মাদকই নকল রাসায়নিক দিয়ে তৈরি, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।
এই নকল উপাদানযুক্ত মাদকগুলোর মূল গ্রাহক গোষ্ঠী মূলত সম্পদশালী ব্যক্তিরা, যাঁদের চাহিদা উচ্চ। তবে, সংশ্লিষ্ট সংস্থা আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের আগে মাদকগুলোর সুনির্দিষ্ট নাম প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পূর্বে দেশীয় সীমানা পার হয়ে ইয়াবা, হেরোইন ও বিভিন্ন সিনথেটিক মাদক বড় পরিমাণে আনা হতো। সীমান্তে প্রযুক্তি-ভিত্তিক স্ক্যানিং, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ার ফলে এই বড় চালানগুলো ধরা পড়ছে বেশি। ফলে ডিলাররা ছোট স্কেলে উৎপাদন করে বিক্রি করার দিকে ঝুঁকেছে।
এই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ ১১ ডিসেম্বরের ঘটনা, যখন প্রথমবারের মতো এমডিএমবি যুক্ত ভেপ পণ্য জব্দ করা হয়। এই মাদক মালয়েশিয়া থেকে সংগ্রহ করা হয় এবং ডিএনসি বহু সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করেছে। জব্দকৃত পণ্যগুলো ভেপ ই-সিগারেটের তরল হিসেবে বিক্রি হচ্ছিল, যা ব্যবহারকারীদের জানাতে না পারায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
সমন্বিত বাহিনী দাবি করে যে, নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক মাদক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও কুরিয়ার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই চ্যানেলগুলো ব্যবহার করে ডিলাররা গোপনীয়তা বজায় রেখে অল্প পরিমাণে পণ্য সরবরাহ করে, ফলে ট্র্যাকিং কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিনথেটিক ড্রাগের রাসায়নিক গঠন দ্রুত পরিবর্তন হওয়ায় আইনগত তালিকাভুক্তি ও ল্যাবরেটরি শনাক্তকরণে বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। অনেক সময় এই মাদকগুলোকে “হারবাল” বা “সেফ” বলে বাজারজাত করে ব্যবহারকারীকে বিভ্রান্ত করা হয়। ফলে সাধারণ জনগণ সঠিক ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত না থেকে সেবন চালিয়ে যায়।
ডিএনসি তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে যে, বর্তমানে বাজারে কয়েকটি নির্দিষ্ট সিনথেটিক মাদক বেশি সক্রিয়। এসব মাদক দ্রুত উৎপাদন ও বিতরণে সক্ষম, ফলে মাদক চক্রের কৌশল ক্রমাগত পরিবর্তনশীল।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন যে, দমনমূলক অভিযান অপরিহার্য হলেও প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন প্রোগ্রাম ছাড়া সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্যভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি, নির্ভরতা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সম্প্রসারণ জরুরি।
অধিকন্তু, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারীরা একসাথে কাজ করে একটি সমন্বিত কৌশল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। সীমান্তে ডিজিটাল নজরদারি, আইনের দ্রুত হালনাগাদ, আধুনিক ল্যাব সুবিধা এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থা একসাথে চালু করলে মাদক চক্রের বিস্তার ধীর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে জব্দকৃত মাদক ও সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছে; আদালতে প্রথম শুনানি শীঘ্রই নির্ধারিত হয়েছে। তদন্তকারী দল অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য সীমান্তে এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেসে তদারকি বাড়িয়ে চলেছে। ভবিষ্যতে আরও বড় জব্দ এবং গ্রেফতার প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যাতে মাদক ব্যবসার নতুন রূপকে দমন করা যায়।



