পাকিস্তান রবিবার ভোরে আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সন্ত্রাসী শিবির ও গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়, যার ফলে নারী ও শিশুসহ অনেকে আহত হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করে যে, তাদের কাছে ‘অকাট্য প্রমাণ’ রয়েছে যে এই হামলা ‘খারিজি’ নামে পরিচিত পাকিস্তানি তালেবান (তেহরিক‑ই‑তালেবান) পরিচালিত। এই গোষ্ঠীকে ইসলামাবাদে পাকিস্তান সরকার ‘কহারিজি’ বলে উল্লেখ করে, এবং তারা আফগানিস্তানে অবস্থানরত তাদের নেতৃত্বের নির্দেশে এই আক্রমণ সম্পন্ন করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, পাকিস্তান গৌণ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সীমান্ত বরাবর সাতটি সন্ত্রাসী শিবির এবং ইসলামিক স্টেট খোরসান প্রদেশের (আইএস‑কেপি) গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট আক্রমণ চালিয়েছে। লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে পাকিস্তানি তালেবান ও আইএস‑কেপি সংযুক্ত শিবির অন্তর্ভুক্ত, যা পূর্বে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত ছিল।
এই পদক্ষেপটি আফগানিস্তানে সাম্প্রতিক ধারাবাহিক আত্মঘাতী বোমা হামলার পর নেওয়া হয়েছে, যেগুলোকে পাকিস্তানি ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত গোষ্ঠীর দায়ে আনা হয়। বিশেষ করে অক্টোবর মাসে সীমান্তে সংঘটিত সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ৭০‑এর বেশি মানুষ নিহত হওয়ায়, এই আক্রমণটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ও বিস্তৃত হিসেবে বিবেচিত।
আফগান তালেবান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায়, ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের জানামতে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। একই সময়ে কাবুলের সরকার ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে যে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, হামলা প্রধানত নানগারহার ও পাখতিকা প্রদেশে সংঘটিত হয়েছে, যেখানে কয়েক ডজন মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা আহত হয়েছে। আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের মতে, পাকিস্তানি জেনারেলরা দেশের নিরাপত্তা দুর্বলতা ঢাকতে এই ধরনের আক্রমণকে ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
এএফপির একজন সাংবাদিক নানগারহারের বিহসুদ জেলায় সরাসরি গিয়েছে এবং দেখেছেন, ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে স্থানীয় বাসিন্দারা বুলডোজার ব্যবহার করছেন। অনামিক নিরাপত্তা কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, একই জেলায় একটি বাড়ি লক্ষ্য করে চালানো হামলায় ১৭ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১২ জন শিশু ও কিশোর।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতিনির্ধারকরা এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সরাসরি সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে সীমান্তে অবৈধ অস্ত্র সরবরাহ ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের উন্মোচন সম্ভব হয়। একই সঙ্গে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই ধরনের আক্রমণকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, পাকিস্তানের এই বিমান হামলা কেবল তৎকালীন আত্মঘাতী বোমা হামলার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক চাপের অংশ, যেখানে পাকিস্তান তার সীমান্তে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি কমাতে চায়। তবে, এই ধরনের আক্রমণ উভয় দেশের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাসকে আরও তীব্র করতে পারে এবং ভবিষ্যতে সীমান্তে অতিরিক্ত সামরিক সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পরবর্তী সপ্তাহে দু’দেশের কূটনৈতিক মঞ্চে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচনার সূচনা হতে পারে, যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উভয় পক্ষকে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বজায় রাখতে চাপ দেবেন। যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তবে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থির হতে পারে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা নীতিতে প্রভাব ফেলবে।



