রমজান মাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকাংশ সদস্য ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখেন। এই সময়ে খাবার দু’বার, সেহরি ও ইফতার, সীমাবদ্ধ থাকায় পুষ্টিকর খাবারের পরিকল্পনা স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সঠিক পুষ্টি শক্তি, তরলসাম্য এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সমর্থন করে, ফলে রোজা রাখার সময় ক্লান্তি ও হজমজনিত সমস্যার ঝুঁকি কমে।
সেহরি ও ইফতার ছাড়া অন্য কোনো খাবার গ্রহণ না করা মানে খাবারের সময়সূচি ও পরিমাণের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। খাবারকে ভাগ করে গ্রহণ করলে রক্তে শর্করার স্তর স্থিতিশীল থাকে এবং শরীরের জলের চাহিদা পূরণ হয়।
সেহরির শুরুতে প্রচলিত সুন্নাহ অনুসরণ করা যায়: এক থেকে তিনটি খেজুর এবং এক গ্লাস পানি, দুধ বা তাজা ফলের রস গ্রহণ করা। খেজুর দ্রুত রক্তে গ্লুকোজ বাড়ায়, পটাসিয়াম সরবরাহ করে এবং তরলসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
এরপর হালকা কোনো স্যুপ, যেমন ডাল বা সবজি স্যুপ, ছোট বাটিতে নেওয়া যেতে পারে। স্যুপের তরল পেটকে ধীরে ধীরে কাজ করতে প্রস্তুত করে এবং অতিরিক্ত তরল সরবরাহ করে।
মূল খাবারের প্লেটকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে জটিল কার্বোহাইড্রেট রাখা উচিত, যেমন সম্পূর্ণ শস্যের ভাত, ওটস, বার্লি বা সম্পূর্ণ গমের রুটি। এই খাবারগুলো ধীরগতিতে শক্তি সরবরাহ করে, ফলে রোজা শেষে তাড়াতাড়ি ক্ষুধা না লাগে।
দ্বিতীয় ভাগে লীন প্রোটিন অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। গ্রিল করা মুরগি, বেক করা মাছ, ডাল, মসুর বা ডিমের মতো খাবার পেশীর মেরামত ও তৃপ্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে।
অর্ধ ভাগে সবজি ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত। তাজা সালাদ, সাঁতলানো সবজি বা হালকা স্যুপ ভিটামিন, খনিজ এবং অতিরিক্ত তরল সরবরাহ করে, যা হাইড্রেশন বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
একটু পরিমাণে স্বাস্থ্যকর চর্বি যোগ করা দরকার। অলিভ তেল, বাদাম, তিলের বীজ বা কুমড়ার বীজের মতো উপাদান পুষ্টি শোষণ বাড়ায় এবং তৃপ্তি দেয়।
পানীয় গ্রহণে একবারে বড় পরিমাণে না করে ধীরে ধীরে গ্লাসে গ্লাস করে পানি পান করা উত্তম। এতে পেটের উপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে হাইড্রেশন বজায় থাকে।
পানীয়ের পাশাপাশি জলীয় ফলের ব্যবহার বাড়ানো যায়। তরমুজ, কমলা, শসা ইত্যাদি ফলের উচ্চ জলের পরিমাণ রোজার সময় দেহকে হাইড্রেটেড রাখে। ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ের বদলে হার্বাল চা, যেমন পুদিনা বা আদা চা, হালকা বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
মিষ্টি ও ভাজা খাবার ইফতারে মাঝে মাঝে উপভোগ করা যায়, তবে অতিরিক্ত গ্রহণ এড়িয়ে চলা উচিত। অতিরিক্ত চিনি ও তেল শরীরকে অলস করে এবং হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
প্রোটিনের উৎস হিসেবে ডিম, দই, দুধ, পনির, ছোলা ডাল, মুগ ডাল বা হালকা মাছের কারি ব্যবহার করা যায়। এই খাবারগুলো সহজে হজম হয় এবং প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড সরবরাহ করে।
জটিল কার্বোহাইড্রেটের জন্য সম্পূর্ণ গমের রুটি, বাদামী চাল, লাল চাল, ওটস বা হালকা ভিজিয়ে রাখা চিরা ব্যবহার করা যেতে পারে। এই খাবারগুলো রক্তে শর্করার স্তর ধীরে ধীরে বাড়ায়।
ফল ও সবজির মধ্যে কলা, পেঁপে, আপেল, শসা বা হালকা রান্না করা পুয় শাক ও পালং শাক অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এরা ফাইবার ও পুষ্টি সরবরাহের পাশাপাশি দেহকে হাইড্রেটেড রাখে।
স্বাস্থ্যকর চর্বির জন্য কাজু, বাদাম, তিলের বীজ, কুমড়ার বীজ বা সামান্য সরিষা তেল, বাদাম তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। এই চর্বি গোষ্ঠী ভিটামিন শোষণ ও তৃপ্তি বাড়ায়।
একটি সহজ সেহরি মেনু হতে পারে সম্পূর্ণ গমের রুটি, ডিম বা পনিরের সাথে শসা বা সালাদের সাইড। এই সংমিশ্রণ প্রোটিন, কার্ব এবং ফাইবারের সুষম ভারসাম্য বজায় রাখে।
অত্যধিক লবণযুক্ত বা তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ সেগুলো দেহে অতিরিক্ত পানির ধারণা বাড়িয়ে ডিহাইড্রেশন ঘটাতে পারে।
সর্বোপরি, রোজার সময় সঠিক খাবার নির্বাচন, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখে। আপনার সেহরি ও ইফতারকে কীভাবে পরিকল্পনা করবেন, তা নিয়ে আপনি কি কোনো পরিবর্তন আনতে চান?



