সালেহউদ্দিন আহমেদ, যিনি একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর অর্থ উপদেষ্টা পদে ছিলেন, নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য ২৯ পৃষ্ঠার একটি উত্তরাধিকার নোট জমা দিয়েছেন। নোটে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির তদারকি একসাথে করার ফলে স্বার্থের সংঘাত ও স্বচ্ছতার অভাবের কথা তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে মুদ্রানীতি নির্ধারণের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ-তদারকি পরিচালনা করে। এই দ্বৈত ভূমিকা স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়ায় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কাজের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সালেহউদ্দিন আহমেদ এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য আলাদা তদারকি সংস্থার গঠন প্রস্তাব করেন।
নোটে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকার নীতিগত সমর্থন দিলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) একটি ধারণাপত্র প্রস্তুত করতে পারে। এই ধারণাপত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কার্যক্রম—যেমন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রানীতি—কে আলাদা করে, তদারকি দায়িত্বকে একটি স্বতন্ত্র সংস্থায় স্থানান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সালেহউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন, দেশের ব্যাংক সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। তিনি যুক্তি দেন, তদারকি কাজের জন্য আলাদা দপ্তর গঠন করলে পুরো ব্যাংক খাত ও অর্থনীতির স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে।
বিশ্বের বেশ কিছু উন্নত দেশে, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপান, ব্যাংক তদারকির জন্য আলাদা দপ্তর রয়েছে। তবে ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশে তদারকি ও মুদ্রানীতি দুটোই কেন্দ্রীয় ব্যাংকেই থাকে। সালেহউদ্দিন আহমেদ এই আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলোকে উল্লেখ করে বাংলাদেশের জন্য আলাদা তদারকি সংস্থা গঠনের পক্ষে যুক্তি দেন।
নোটে আর্থিক বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) সহ বিভিন্ন বিভাগের ভবিষ্যৎ কাজের জন্য সুপারিশ রয়েছে। এসব সুপারিশের মধ্যে ব্যাংক রেজোলিউশন প্রক্রিয়ার স্বতন্ত্র কাঠামো গঠনও অন্তর্ভুক্ত।
সালেহউদ্দিন আহমেদের মতে, তদারকি আলাদা করলে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে এবং আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা বাড়বে। তিনি জোর দেন, এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে ঋণদানের মানদণ্ড ও ঋণগ্রহীতাদের সুরক্ষা বাড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালীন তার অর্থ উপদেষ্টা পদে থাকা অবস্থায় তিনি ব্যাংক তদারকি ও মুদ্রানীতি একসাথে করার সমস্যাগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বর্তমান নীতিনির্ধারকদের জন্য এই সুপারিশগুলো প্রস্তুত করেছেন।
নোটে উল্লেখিত ধারণাপত্রের প্রস্তুতির জন্য সরকারী সমর্থন প্রয়োজন। যদি সরকার এই প্রস্তাব গ্রহণ করে, তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে নতুন তদারকি সংস্থার কাঠামো ও কার্যপ্রণালী নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হবে।
এই প্রস্তাবের বাস্তবায়ন ব্যাংকিং সেক্টরের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। তদারকি সংস্থার স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করলে আর্থিক সংস্থার কার্যক্রমে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি কমবে।
সালেহউদ্দিন আহমেদের সুপারিশের পটভূমিতে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের সময়কালে বাণিজ্যিক ব্যাংক নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তদারকি আলাদা করার আহ্বান বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
সারসংক্ষেপে, সালেহউদ্দিন আহমেদের উত্তরাধিকার নোটে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি ও তদারকি কার্যক্রমকে পৃথক করার সুপারিশ করা হয়েছে। যদি সরকার নীতিগত সমর্থন দিয়ে ধারণাপত্র তৈরি করে, তবে ব্যাংকিং সেক্টরের স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।



