ইরান সরকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলোকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করেছে। তেহরানের দৃষ্টিতে এই শর্তগুলো কোনো আলোচনা বিষয় নয়, বরং আত্মসমর্পণের সমতুল্য হিসেবে বিবেচিত। শর্তগুলোর মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ বন্ধ করা, ব্যালিস্টিক ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরিমাণ কমিয়ে ইসরাইলের জন্য হুমকি না তৈরি করা, অঞ্চলভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন বন্ধ করা এবং মার্কো রুবিওর উল্লেখিতভাবে ইরানের নাগরিকদের প্রতি আচরণ পরিবর্তন করা অন্তর্ভুক্ত।
ইরান সরকার এই দাবিগুলোকে দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর মূল উপাদান হিসেবে দেখছে। তেহরান দীর্ঘ বছর ধরে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক মিত্রের অভাবে নিজস্ব প্রতিরোধের অক্ষ গড়ে তুলেছে, যা মূলত প্রক্সি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে। এই নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্য ইরানের সীমান্তে সংঘাত দূরে রাখা এবং চাপকে ইসরাইলের দিকে সরিয়ে দেওয়া।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ইরানের সীমিত বিমানবাহিনী ও উন্নত সামরিক প্রযুক্তিতে প্রবেশের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। সরকার এটিকে শান্তিপূর্ণ বলে বর্ণনা করলেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে প্রতিরোধমূলক ক্ষমতা হিসেবে মূল্যায়ন করে। এই প্রোগ্রামটি ইরানের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শর্তগুলো মেনে নেওয়াকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সীমিত যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক বলে মনে করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, শর্তগুলো গ্রহণ করলে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়বে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
ইরান যদিও সামরিক সংঘাতের উচ্চ খরচ স্বীকার করে, তবে তারা সম্পূর্ণ কৌশলগত পশ্চাদপসরণকে অগ্রাধিকার দেয় না। বরং তারা এমন একটি অবস্থান বজায় রাখতে চায় যেখানে সীমিত সংঘাত টিকে থাকতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা হুমকি না হয়। এই হিসাব-নিকাশের মধ্যে গভীর ঝুঁকি লুকিয়ে আছে, যা শুধুমাত্র ইরানের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।
মার্কিন সরকার কোনো সামরিক অভিযান শুরু করলে প্রথম ধাপে শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যদি খামেনি নিহত হন, তবে ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা শাসনের সমাপ্তি ঘটবে এবং উত্তরাধিকারী নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে। এই পরিস্থিতি ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলো, যেগুলো সাম্প্রতিক দমন-পীড়নের পর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় রয়েছে, এমন আক্রমণের ফলে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এই সংস্থাগুলো ইরানের নিরাপত্তা নীতি ও বাহ্যিক হুমকির মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই তাদের ক্ষমতা হ্রাস হলে দেশের সামগ্রিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহে রাস্তায় নেমে আসা প্রতিবাদকারীরা, যারা পূর্বে সরকারী দমনযন্ত্রের মুখোমুখি হয়েছিলেন, এখনো গভীরভাবে ক্ষুব্ধ। তারা ইরানের আন্তর্জাতিক চাপে সাড়া না দিয়ে নিজের স্বার্থ রক্ষার দাবি তুলে ধরছে। এই জনমত গোষ্ঠীর শক্তি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, শর্ত অস্বীকারের পর কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি অব্যাহত থাকবে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্রতা বাড়তে পারে। ইরান সরকার সম্ভবত তার প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চাপ বজায় রাখবে, আর মার্কিন সরকার নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় অতিরিক্ত পদক্ষেপ নিতে পারে।
পরবর্তী ধাপে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতা ও আলোচনার সুযোগ পুনরায় উন্মুক্ত করা হতে পারে, তবে তা ইরানের নিরাপত্তা উদ্বেগকে সন্তোষজনকভাবে সমাধান করতে পারবে কিনা তা অনিশ্চিত। উভয় পক্ষের জন্যই শর্তের পুনর্বিবেচনা ও সমঝোতা অর্জনই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার একমাত্র পথ হতে পারে।



