ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পের নতুন দুই রুটের নির্মাণ খরচ প্রতি কিলোমিটারে উত্তরা‑মতিঝিল রুটের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হওয়ায় বাজেটের ওপর চাপ বাড়ছে। এই দুই রুটের খরচের পার্থক্য সরকারকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার আগে সিদ্ধান্তের জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল, যা লাইন‑৬ নামে পরিচিত, প্রতি কিলোমিটারে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এই রুটের ঠিকাদার ২০১৫ সালে নিয়োগ করা হয় এবং তখনই অতিরিক্ত পাঁচটি রুটের পরিকল্পনা ঘোষিত হয়।
নতুন দুই রুটের খরচ প্রতি কিলোমিটারে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা, যা পূর্বের রুটের তুলনায় প্রায় দুগুণ। উভয় রুটের সম্মিলিত ব্যয় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মেট্রোরেল প্রকল্পের সামগ্রিক আর্থিক ভারকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রথম রুটটি কমলাপুর থেকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত, মোট দৈর্ঘ্য ৩১ কিলোমিটারের বেশি এবং মেট্রোরেল লাইন‑১ নামে পরিচিত। এই রুটের কিছু অংশ উঁচু পথে, আর কিছু অংশ ভূগর্ভস্থভাবে নির্মিত হবে।
দ্বিতীয় রুটটি সাভার হেমায়েতপুর থেকে মিরপুর, গুলশান ও ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত, প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং মেট্রোরেল লাইন‑৫ (উত্তর) নামে চিহ্নিত। এই রুটেও উঁচু ও ভূগর্ভস্থ উভয় ধরণের নির্মাণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের মতে, এত উচ্চ ব্যয়ে মেট্রোরেল চালু হলে ভ্রমণকারীর ভাড়া বাড়বে এবং সরকারের ঋণভারও তীব্র হবে। তাই ভাড়া নির্ধারণে চাপ বাড়বে এবং আর্থিক দায়িত্বের ভার বাড়বে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এখনো এই বিশাল ব্যয়ের প্রকল্পের অনুমোদন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি, ফলে প্রকল্পের অগ্রগতি অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। সরকারী সিদ্ধান্তের দেরি প্রকল্পের সময়সূচি ও বিনিয়োগকারীর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, উচ্চ ব্যয়ের মূল কারণ দরপত্রে প্রতিযোগিতার সীমিত সুযোগ। বর্তমানে শুধুমাত্র জাপানি ঠিকাদারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে, ফলে দরদাম কমে খরচ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি প্রকল্পের আর্থিক দক্ষতা হ্রাসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদও একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, জাপানি ঋণদাতা সংস্থা জাইকা (JICA) প্রকল্পের অর্থায়নে কিছু প্রকৌশলগত শর্ত যুক্ত করেছে, যা শুধুমাত্র জাপানি কোম্পানিগুলোকে ঠিকাদার হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়। ফলে খরচের বৃদ্ধি অনিবার্য হয়েছে।
JICA উল্লেখ করেছে, মেট্রোরেল নির্মাণের ব্যয় বিভিন্ন উপাদানের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং স্থানীয় ভূগোলিক বৈশিষ্ট্য। তবে শর্তের কঠোরতা এবং সীমিত প্রতিযোগিতা ব্যয়কে বাড়িয়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, উচ্চ ব্যয় ভাড়া বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করবে, যা ব্যবহারকারীর চাহিদা ও আয়তনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে, সরকারী ঋণবহির্ভূত ব্যয় বাড়লে আর্থিক বাজারে ঝুঁকি প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ভবিষ্যৎ অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়নকে কঠিন করে তুলবে।
অবশিষ্ট সময়ে সরকার যদি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করে এবং জাপানি শর্তের পরিবর্তে বহুমুখী ঋণদাতার সঙ্গে আলোচনা করে, তবে ব্যয় হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে তা না হলে মেট্রোরেল প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা ও আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াবে।



