গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে এক দশকের বেশি সময় পর প্যারোলে মুক্তি পাওয়া রানা প্লাজা মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানা, শনিবার সন্ধ্যায় সাভার পৌর এলাকার মাদরাসা মসজিদে তার মায়ের জানাযায় অংশ নেন। জানাযা অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সামনে তিনি নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
সোহেল রানা জানাযা শেষে উপস্থিত ভক্ত ও প্রতিবেশীদের উদ্দেশে বলেন, “আমার মায়ের জন্য সবাই দোয়া করবেন এবং আমার অতীতের ভুলের জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন।” তার এই অনুরোধের পরই পুলিশ তাকে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে সাভার থেকে গৃহে ফেরত আনে।
মায়ের জানাযা শেষে রানা প্রায় সাড়ে সাতটায় আবার কারাগারে ফিরে যান। তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, যারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেন।
রানার চাচাতো ভাই জাহাঙ্গীর আলম জানান, মিসেস মার্জিনা বেগম, রানা রানের মা, দীর্ঘদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন এবং শুক্রবার রাত ল্যাব এড হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার মৃত্যুর পরপরই রানা প্যারোলে আবেদন করেন এবং আদালত অনুমোদন করে তাকে সন্ধ্যায় সাভারে নিয়ে আসে।
রানা প্লাজা দুর্ঘটনা ২৪ এপ্রিল ২০১৩-এ সাভার বাসস্ট্যান্ডের সংলগ্ন দশতলা ভবনে ঘটেছিল। ঐ দিন গঠিত রানা প্লাজা ভবনে একাধিক পোশাক কারখানা অবস্থিত ছিল এবং প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করছিলেন। নির্মাণের নিরাপত্তা মানদণ্ডের ঘাটতি ও অযথা ত্রুটিপূর্ণ কাঠামোর কারণে পুরো ভবন ধসে পড়ে।
ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধার কাজের জন্য তৎপরতা দেখিয়ে রেসকিউ টিম ১,১৩৬ জনের দেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে ২,৪৩৮ জনকে ধ্বংসাবশেষের নিচ থেকে বেঁচে বের করা যায়, যার মধ্যে প্রায় দুই হাজার কর্মী গুরুতর আঘাত পেয়ে অক্ষম বা অস্থায়ীভাবে অক্ষম অবস্থায় রয়ে যায়।
দুর্ঘটনার পরপরই তদন্তকারী সংস্থা ও সরকারী দপ্তর ঘটনাস্থলে তদন্ত চালায় এবং দায়ী ব্যক্তিদের ওপর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। পাঁচ দিন পর, ২৯ এপ্রিল, সোহেল রানা যশোরের বেনাপোল সীমান্তে গিয়ে ভারতের দিকে পালানোর চেষ্টা করার সময় গ্রেপ্তার হন এবং র্যাব (রিজার্ভড বন্ড) জারি করা হয়।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে রানা বিভিন্ন আদালতে মামলার সম্মুখীন হয়। রানা প্লাজা ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট মৃত্যুহার, আঘাতপ্রাপ্ত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা মানদণ্ডের লঙ্ঘন সংক্রান্ত অভিযোগে তাকে বহু অপরাধের জন্য দায়ী করা হয়েছে। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে রায়ের আপিল ও অতিরিক্ত প্রমাণ উপস্থাপনের প্রক্রিয়া চলমান।
আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি, শ্রমিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলি রানা প্লাজা মামলায় ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার জন্য চাপ বজায় রাখছে। রানা রায়ের পরেও প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মায়ের জানাযায় অংশ নেওয়া ঘটনাটি সমাজে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে, যেখানে কিছু লোক তার ক্ষমা চাওয়াকে মানবিক দিক হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে, আবার অন্যরা তার অপরাধের গুরুত্বর প্রতি শূন্যতা প্রকাশ করেছে।
সাভারের মাদরাসা মসজিদে অনুষ্ঠিত জানাযা অনুষ্ঠানটি রানা প্লাজা মামলার দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াইয়ের একটি নতুন পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে আদালত কী রায় দেবে এবং রানা কীভাবে তার শাস্তি সম্পন্ন করবেন, তা দেশের শ্রমিক নিরাপত্তা নীতি ও আইনি কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলবে।



