ইরানের দক্ষিণ সমুদ্রসীমায় অনুষ্ঠিত সামরিক মহড়ায় শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধজাহাজ ‘শাহিদ সায়্যাদ শিরাজি’ থেকে প্রথমবারের মতো ‘সায়্যাদ ৩-জি’ ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এই পরীক্ষা ইরানের নৌ-আকাশ সংযোগ ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হয়।
শিরাজি জাহাজটি সুলাইমানি ক্লাসের তৃতীয় ইউনিট এবং বর্তমানে ছয়টি ভার্টিক্যাল লঞ্চ সিস্টেম (VLS) সাইলো ধারণ করে। VLS প্রযুক্তি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ঘুরিয়ে না গিয়ে যেকোনো দিক থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সুযোগ দেয়।
সায়্যাদ ৩-জি হল সায়্যাদ ৩-এফের নৌ-সংস্করণ, যার কার্যপরিধি প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। এই পরিসরে শত্রু যুদ্ধবিমান, উচ্চ উচ্চতার ড্রোন এবং ক্রুজ মিসাইলকে সুনির্দিষ্টভাবে ধ্বংস করা সম্ভব।
উল্লম্ব উৎক্ষেপণ পদ্ধতির ফলে জাহাজটি একাধিক ক্ষেপণাস্ত্রকে স্বল্প সময়ে ধারাবাহিকভাবে ছুঁড়ে দিতে পারে, যা সমন্বিত বড় আকারের আক্রমণ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা প্রদান করে। ঐতিহ্যগতভাবে জাহাজকে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ঘুরিয়ে নিক্ষেপ করতে হতো, এখন তা প্রয়োজনীয় নয়।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, এই ক্ষমতা ইরানের দক্ষিণ উপকূলীয় জলসীমায় একটি বিশাল এয়ার ডিফেন্স বাবল গঠন করেছে। উল্লম্ব লঞ্চের দ্রুততা এবং দীর্ঘ পরিসরের মিলিত প্রভাব জাহাজকে আকাশ থেকে আসা হুমকি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম করে।
এ ধরনের বুদবুদ গঠন পারসিয়ান উপসাগরের কৌশলগত পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোই আঞ্চলিক নৌ-আকাশ ক্ষমতার প্রধান ধারক হিসেবে বিবেচিত হতো, এখন ইরান নিজস্ব নৌ-আকাশ সংযোগে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে অগ্রসর।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, শিরাজি জাহাজের এই উন্নতি ইরানের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন সূচিত করতে পারে। দক্ষিণে অবস্থিত তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রের সুরক্ষা, পাশাপাশি শিপিং রুটের নিরাপত্তা এখন আরও শক্তিশালী হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, এই উন্নয়নকে অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্কতা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং তার এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের সঙ্গে সম্ভাব্য পারস্পরিক ক্রিয়া নিয়ে বিশ্লেষকরা আলোচনা করছেন।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড নৌবাহিনী (IRGCN) এখন শিরাজি জাহাজকে ‘ভাসমান দুর্গ’ হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম, যা সমুদ্রসীমায় স্থায়ী উপস্থিতি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করে। এই পরিবর্তন ইরানের সামরিক কৌশলে নৌ-আকাশ সমন্বয়কে কেন্দ্রীয় ভূমিকা দেয়।
ভবিষ্যতে ইরান একই ধরনের VLS সিস্টেমসহ অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজের নির্মাণ পরিকল্পনা চালু করেছে, যা দেশের সামগ্রিক নৌ-আকাশ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। এছাড়া স্থলভিত্তিক সায়্যাদ সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বয় করে একাধিক স্তরের রক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ইরানের এই পদক্ষেপ পারসিয়ান উপসাগরের শক্তি গঠনকে পুনর্গঠন করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের ক্ষেত্রে নৌ-আকাশ সমন্বিত প্রতিরক্ষা কৌশলকে প্রাধান্য দেবে। তবে একই সঙ্গে এটি অঞ্চলের উত্তেজনা বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি করে।
সারসংক্ষেপে, শিরাজি যুদ্ধজাহাজে সায়্যাদ ৩-জি ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণ ইরানের সামুদ্রিক সীমান্তে আধুনিক এয়ার ডিফেন্সের নতুন স্তর উন্মোচন করেছে। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ইরানের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে শক্তিশালী করে এবং পারসিয়ান উপসাগরের সামরিক গতিবিদ্যায় নতুন গতিপথ নির্ধারণের সম্ভাবনা রাখে।



