শুক্রবার বিকেলে ঢাকার আগারগাঁয়ে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উন্মুক্ত চত্বরের মঞ্চে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্মরণে ১৫টি ভিন্ন ভাষার কবিতা ও অনুবাদ উপস্থাপন করা হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল দেশের বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর মাতৃভাষার বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে একসাথে উদযাপন করা। অনুষ্ঠানটি স্থানীয় ও বিদেশি দর্শকদের সমবেত করে ভাষা সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় বাঁশির সুরে একটি দেশীয় গানের পরিবেশনা দিয়ে, যেখানে ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সুরে বর্ণনা করা হয়। এরপর প্রমিলা বিশ্বাস ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গেয়ে উপস্থিতদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম উল্লেখ করেন, তিনি ভাষা বৈচিত্র্যকে তুলে ধরতে এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে এই ধারাবাহিক অনুষ্ঠানটি চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম দেশের সাংস্কৃতিক ঐক্যকে শক্তিশালী করে।
অনুষ্ঠানে মোট ১৫টি ভাষার কবিতা ও তাদের বাংলা অনুবাদ উপস্থাপন করা হয়। মারমা, গারো, মণিপুরি, সাদ্রি, মান্দি, চাকমা, খেয়াং, মাহাতো, ম্রো, ককবরক, সানতাল, ইংরেজি, ফরাসি, চীনা এবং অন্যান্য ভাষা অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতিটি ভাষার কবিতা আলাদা শিল্পীর দ্বারা আবৃত্তি করা হয়।
আবুল হোসেনের ‘তোমাকে নিয়ে যত খেলা’ কবিতাটি ইকবাল খোরশেদ মঞ্চে উপস্থাপন করেন, যা শ्रोतাদের মধ্যে গভীর সাড়া ফেলেছিল। মারমা ভাষার ‘নৈরীসীহ্ টাইংখুংলাহ’ কবিতাটি মারমা গোষ্ঠীর মংহাই নু মারমা গর্বের সঙ্গে পাঠ করেন।
সাদ্রি ভাষায় রচিত ‘২১ ফেব্রুয়ারি’ কবিতাটি সাথী তির্কী উপস্থাপন করেন, আর গারো গোষ্ঠীর মান্দি ভাষায় ‘নাংখো খাসারা সালাম ও নিথুগিপা’ কবিতাটি মতেন্দ্র মানকিনের কণ্ঠে শোনা যায়। মনিপুরি ভাষার ‘লালগৌগী বা্রী’ রুমিতা সিনহা আবৃত্তি করেন, এবং হাজং ভাষার ‘আমারৌ নি থামে’ টুম্পা হাজং উপস্থাপন করেন।
চাকমা ভাষায় ‘উঃম লুলোঙ’ রমিতা চাকমা পাঠ করেন, খেয়াং ভাষায় ‘উলুং-অং ক্যহ্ আ-সা-ম’ অংক্রাথুই খেয়াং উপস্থাপন করেন। মাহাতো ভাষার ‘একলে হাটব’ পলাশ কুমার মাহাতো গাইছেন, এবং ম্রো ভাষার ‘আকম আক্তাত ছুং’ সং ক্রাত ম্রো উপস্থাপন করেন।
ইংরেজি ভাষায় রবার্ট ফ্রস্টের ‘স্টপিং বাই উডস অন আ স্নো ইভিনিং’ তামান্না সারোয়ারের কণ্ঠে শোনা যায়, যা আন্তর্জাতিক কবিতার সুরে স্থানীয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। ফরাসি ভাষায় শার্লস বোদলেয়ারের ‘করেসপন্ডেন্স, লেস ফ্লুরস দে মাল’ হোসাইন মাহমুদের কণ্ঠে উপস্থাপিত হয়। চীনা ভাষায় অনিকা আক্তার একটি কবিতা পাঠ করেন, এবং মনোয়ার মাহমুদ তার বাংলা অনুবাদ শেয়ার করেন, যার অর্থ ‘আমি এই ভূমিকে ভালোবাসি’।
ককবরক ভাষার ‘খাকসোমা’ কবিতাটি সাগর ত্রিপুরা উপস্থাপন করেন, আর সানতাল ভাষায় ‘মিত টেন গোগো দন’ আদিত্য মারের কণ্ঠে শোনা যায়। এই বহুভাষিক মঞ্চে প্রতিটি গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ভাষার সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।
অনুষ্ঠানটি ভাষা সংরক্ষণ ও বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের মডেল হিসেবে কাজ করেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি অনুপ্রেরণার উৎস, যেখানে তারা বিভিন্ন ভাষার কবিতার মাধ্যমে ঐতিহ্য ও পরিচয়কে অনুভব করতে পারে।
**ব্যবহারিক টিপ:** যদি আপনি আপনার বিদ্যালয় বা কমিউনিটিতে অনুরূপ অনুষ্ঠান আয়োজন করতে চান, তবে স্থানীয় ভাষাভাষী কবি ও শিল্পীদের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের সৃষ্টিকর্মকে বাংলা অনুবাদসহ উপস্থাপন করুন; এভাবে ভাষা বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান ও সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।



