স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো শনিবার রাশিয়া থেকে তেল সরবরাহ পুনরায় না শুরু হলে, ইউক্রেনের জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার সতর্কতা দেন। এই হুমকি রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, ইউরোপীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র আলোচনার সূচনা করে।
রাশিয়া থেকে স্লোভাকিয়ায় তেল পৌঁছানোর মূল রুট হল ড্রুজবা পাইপলাইন, যা ইউক্রেনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। প্রায় এক মাসের বেশি সময় ধরে কিয়েভের সিদ্ধান্তে এই পাইপলাইন বন্ধ রয়েছে, ফলে স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি উভয়ই তেল সরবরাহে ঘাটতি অনুভব করছে।
কিয়েভ ২৭ জানুয়ারি জানিয়েছিল যে, রাশিয়ার ড্রোন আক্রমণে ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে পাইপলাইনের সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে তেল প্রবাহ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এই আক্রমণকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যা জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে চলেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মাত্র স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি রাশিয়া সরবরাহ করা তেলের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। দু’দেশই ড্রুজবা পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে তেল গ্রহণ করে এবং ইউরোপীয় জ্বালানি নীতির বিরোধী অবস্থান বজায় রাখছে।
স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি উভয়ই এই সপ্তাহে রাশিয়ার কাছ থেকে মূল ড্রুজবা পাইপলাইন দিয়ে তেল সরবরাহ পুনরায় শুরু করার দাবি জানিয়েছে। তারা তেল সরবরাহ পুনরায় না হলে অর্থনৈতিক ও শিল্প খাতে প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছে।
ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিড রাশিয়ার আক্রমণের ফলে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, দেশটি ইউরোপীয় দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে স্লোভাকিয়া সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী, যা ইউক্রেনের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৮ শতাংশ পূরণ করে।
ফিকো এক্স-এ-এক পোস্টে জানিয়েছেন, “যদি সোমবারের মধ্যে স্লোভাকিয়ায় তেল সরবরাহ পুনরায় শুরু না হয়, আমি রাষ্ট্র মালিকানাধীন যৌথ স্টক কোম্পানি SEPS-কে ইউক্রেনে জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার নির্দেশ দেব।” এই বিবৃতি তেল সরবরাহ ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ তুলে ধরে।
ইউক্রেনের কূটনৈতিক মিশন ইউরোপীয় ইউনিয়নে একটি চিঠির মাধ্যমে বিকল্প সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্রপথে তেল আনা অথবা তেল পরিবহন ব্যবস্থা ব্যবহার করে সরবরাহ চালিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রস্তাব রাশিয়ার পাইপলাইন বন্ধের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
অক্টোবর থেকে রাশিয়া নিয়মিতভাবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে। এই ধারাবাহিক আক্রমণ শীতকালে বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদনকে ব্যাহত করেছে, ফলে লক্ষ লক্ষ ইউক্রেনীয় মানুষ বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় ঠাণ্ডার মুখোমুখি হচ্ছে।
শীতের তীব্রতা এবং বিদ্যুৎ ঘাটতি ইউক্রেনের মানবিক সংকটকে বাড়িয়ে তুলেছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির ফলে হাসপাতাল, স্কুল ও শিল্পখাতে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটেছে, যা দেশের পুনর্গঠন ও যুদ্ধের পরিণতি মোকাবেলায় অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরির রাশিয়া-নির্ভরতা ইউরোপীয় জ্বালানি নীতির সঙ্গে দ্বন্দ্বের সূচনা করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়া থেকে গ্যাস ও তেল আমদানি কমানোর পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রাশিয়ার তেল ব্যবহার করছে।
ফিকোর হুমকি এবং ইউক্রেনের বিকল্প সরবরাহের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের জ্বালানি দিকটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। রাশিয়া যদি তেল সরবরাহ পুনরায় না করে, তবে স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপের মুখে রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য হতে পারে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়লে ইউরোপীয় দেশগুলোর মানবিক সহায়তা ও জ্বালানি সমর্থন বাড়তে পারে।
পরবর্তী সপ্তাহে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জ্বালানি দিকের আলোচনায় স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরির অবস্থান কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে। তেল সরবরাহ পুনরায় শুরু না হলে, ইউক্রেনের জরুরি বিদ্যুৎ বন্ধের হুমকি বাস্তবায়িত হতে পারে, যা ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।



