সাইবেরিয়ার লেক বায়কালের বরফের নিচে একটি মিনি‑বাস ডুবে যাওয়ার ফলে সাতজন চীনা পর্যটক এবং রাশিয়ার এক চালকের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। রাশিয়ার ইরকুত্স্ক প্রদেশের গভর্নর ইগর কোবজেভ ঘটনাস্থলে দেহ উদ্ধারের খবর জানিয়ে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
বিকাল শুক্রবার, লেকের পৃষ্ঠে তিন মিটার প্রস্থের বরফের ফাটল থেকে বাসটি গড়িয়ে পড়ে, ফলে গাড়ি সম্পূর্ণভাবে বরফের নিচে ১৮ মিটার (প্রায় ৫৯ ফুট) গভীরতায় ডুবে যায়। স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা তৎক্ষণাৎ ডাইভার দল পাঠিয়ে পানির নিচে ক্যামেরা ব্যবহার করে দেহের সন্ধান শুরু করে।
ডাইভারদের কঠিন কাজের পর, সাতজন চীনা পর্যটক ও রুশ চালকের দেহ পুনরুদ্ধার করা যায়। বাকি এক চীনা পর্যটককে প্রথমে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে জানানো হয়েছিল, তবে পরবর্তীতে তার অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি।
গভর্নর কোবজেভ টেলিগ্রাম পোস্টে শোক প্রকাশের পাশাপাশি উল্লেখ করেন, দুর্ঘটনার সময় এক চীনা পর্যটক তৎক্ষণাৎ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। তিনি স্থানীয় আইন অনুসারে বর্তমানে লেকের বরফে হাঁটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং তা প্রাণঘাতী ঝুঁকি বহন করে বলে সতর্ক করেন।
কোবজেভ আরও জোর দিয়ে বলেন, পর্যটকদের শুধুমাত্র অনুমোদিত ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে লেক বায়কালের বরফে যাওয়া উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, সব চীনা পর্যটক, যার মধ্যে ১৪ বছর বয়সী একটি শিশুও রয়েছে, স্বতন্ত্রভাবে ভ্রমণ করছিলেন, ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব স্পষ্ট হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণের জন্য ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ দল ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে, বরফের ফাটলের গঠন ও গাড়ির গতি বিশ্লেষণ করছে।
চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে দ্রুত একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়, যেখানে তারা রাশিয়ার সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে পর্যটক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায় এবং ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে। দূতাবাসের মুখপাত্র উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে দুদেশের নিরাপত্তা মানদণ্ডে সমন্বয় আনা প্রয়োজন।
চীন ও রাশিয়া দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্বের মধ্যে পর্যটন ক্ষেত্রেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। লেক বায়কাল, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ গভীরতা (১,৬৪২ মিটার) এবং শীতকালে পুরু বরফের স্তর গঠন করে, চীনা পর্যটকদের জন্য জনপ্রিয় গন্তব্য। তবে এই ধরনের দুর্ঘটনা দুদেশের পর্যটন নীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
এই ঘটনার আগে, জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে একই লেকের বরফে একটি চীনা পর্যটক গাড়ি উল্টে যাওয়ার ফলে প্রাণ হারায়। সেই সময়েও চীনা ও রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, তবে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে সমালোচনা করা হয়।
দুর্ঘটনার পরপরই কোবজেভ আবার সামাজিক মাধ্যমে জানিয়ে দেন, শুক্রবার ও শনিবারে দু’টি আলাদা ঘটনার ফলে মোট ছয়জনকে রেসকিউ করা হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, এই ধারাবাহিক ট্র্যাজেডি মানুষকে সতর্কতা অবলম্বন করতে বাধ্য করেছে, তবে এখনও যথেষ্ট শিক্ষা নেওয়া হয়নি।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করেন, লেক বায়কালের মতো প্রাকৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোতে পর্যটন বৃদ্ধি পেলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ অপরিহার্য। রাশিয়া ও চীন উভয়ই ভবিষ্যতে অনুমোদিত গাইড, সুরক্ষিত যাত্রা পরিকল্পনা এবং কঠোর তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োগের মাধ্যমে পর্যটক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
এই দুর্ঘটনা দুদেশের মধ্যে পর্যটন নীতির পুনর্নির্মাণের সংকেত দিচ্ছে এবং লেক বায়কালের বরফে চলাচল সংক্রান্ত নিয়মকানুন কঠোর করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে দ্বিপাক্ষিক সমন্বয় ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।



