২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের উপলক্ষে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা ভাষা আন্দোলনের আদর্শের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতসহ বহু কর্মীর মতে, ভাষা চর্চার জন্য আত্মত্যাগের স্মৃতি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে এবং এখন এই দিনটি কেবল আনুষ্ঠানিক ছুটির দিন হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। তারা দাবি করছেন, দেশের সর্বস্তরে সকল ভাষার ব্যবহার ও চর্চার অধিকার নিশ্চিত না করা পর্যন্ত ভাষা দিবসের প্রকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতার উল্লেখ করেন, আজকের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত একটি দিন, তবে আমরা এখনও ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ সালের ভাষা সংগ্রামের মূল সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এখনো পর্যাপ্ত নয় এবং এই ঘাটতি ভাষা আন্দোলনের মূল লক্ষ্যকে ক্ষুণ্ন করছে।
কল্যাণপুর থেকে পরিবার নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উপস্থিত জাহান মিথুনের মতে, ভাষা চর্চার অবহেলা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভাষা সংরক্ষণে ব্যর্থতা দেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দিয়েছে এবং এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপের প্রয়োজন।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের (মার্ক্সবাদী) সভাপতি সালমান সিদ্দিকী জানান, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের আদর্শিক চেতনা আজকের সমাজে যথাযথভাবে বজায় রাখা যায়নি। তিনি উচ্চ আদালতসহ বিভিন্ন স্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে, ভাষা সংরক্ষণে সক্রিয় উদ্যোগের অভাব রয়েছে এবং একসময় বাংলা একাডেমি যে উদ্যোগ নিত, তা এখন আর দেখা যায় না।
ভোলা থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উপস্থিত মনিরুল ইসলাম ফরাজি রাজনৈতিক দলগুলোর ভাষা নীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলই বাংলা ভাষাকে অগ্রাধিকার দেয় না, যদিও ভাষা নিজেই বহু ভাষার সমন্বয়ে গঠিত একটি চলমান প্রক্রিয়া। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভাষা সংরক্ষণে স্ব-প্রয়োজনীয়তা ছাড়া কোনো বাধা আরোপ করা সম্ভব নয় এবং ভাষার বিস্তারকে উৎসাহিত করা উচিত।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, ২১ ফেব্রুয়ারি এখন কেবল একটি স্মরণীয় দিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার মূল চেতনা বহু বছর ধরে ভুলে যাওয়া হয়েছে। তিনি সতর্ক করেন, এই অবহেলা ধর্মীয় উগ্রতাবাদকে উসকে দিতে পারে এবং দেশের সামাজিক সাদৃশ্যকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
কবি মোহন রায়হানও ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্বের প্রতি আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, ১৯৫২ সালের ইতিহাস মুছে যাওয়া সম্ভব নয়; তবে যদি এই ইতিহাসকে উপেক্ষা করা হয়, তবে তা এক ধরনের ভুল প্রচার হবে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান কিছু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠী এই ঐতিহ্যের বিরোধিতা করছে, যা সমাজে বিভাজনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, ভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতি ও চর্চা নিশ্চিত করতে সকল স্তরে নীতি-নির্ধারণ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সক্রিয় পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা একমত যে, ভাষা দিবসের প্রকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার না করা পর্যন্ত তা কেবল আনুষ্ঠানিক ছুটির দিনেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং দেশের বহু ভাষাভাষী জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।



