যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের প্রান্তে পৌঁছেছেন, তবে তার উপদেষ্টা ও রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরীণ দলীয় সদস্যরা এখন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে মনোযোগ দিতে সতর্ক করছেন। এই সতর্কতা বিশেষ করে নভেম্বরের মাঝামাঝি অনুষ্ঠিত হওয়া কংগ্রেসীয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের পূর্বে প্রকাশিত হয়েছে, যখন রাজনৈতিক ঝুঁকি সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম তের মাসে ট্রাম্পের নীতি পররাষ্ট্র ও সামরিক পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দিয়েছে; তিনি মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০,০০০ সৈন্যের একটি বিশাল সেনাবাহিনী স্থাপন করেছেন এবং ইরানের ওপর বহু সপ্তাহব্যাপী বিমান হামলার পরিকল্পনা চালু করেছেন। একই সময়ে, ইরানের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতি তীব্রতর করা হয়েছে এবং বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য আক্রমণের সিমুলেশন চালানো হয়েছে। তবে এই সামরিক উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের প্রশাসনের অভ্যন্তরে ইরান আক্রমণের জন্য কোনো একমত সমর্থন গড়ে ওঠেনি।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যায়, ৬৫% আমেরিকান নাগরিকের জন্য জীবনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, আর ৪৮% উত্তরদাতা যুদ্ধের সম্ভাবনাকে অতিরিক্ত উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থনৈতিক উদ্বেগের এই উচ্চ শতাংশ ট্রাম্পের ভোটার ভিত্তির মধ্যে বিশেষভাবে তীব্র, যেখানে মধ্যবিত্ত ও কাজের সন্ধানকারী গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত।
হোয়াইট হাউসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান আক্রমণের বিষয়ে প্রশাসনের মধ্যে কোনো একমত সমর্থন নেই এবং ভোটারদের অর্থনৈতিক উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে বিভ্রান্তিকর বার্তা পাঠানো উচিত নয়। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জোর দিয়ে বলছেন, সরকার আর্থিক সমস্যায় ভুগছেন এমন নাগরিকদের কাছে স্পষ্ট ও সঠিক তথ্য প্রদান করতে চায়।
রিপাবলিকান শিবিরের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা এবং রিপাবলিকান পার্টির প্রচারণা কর্মকর্তারা একমত হয়েছেন যে, ট্রাম্পের সর্বোচ্চ শক্তি এখন দেশের আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে কেন্দ্রীভূত করা দরকার। বৈঠকে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি অর্থনৈতিক নীতি সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়, তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পারফরম্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নির্ধারিত হবে; যদি ডেমোক্র্যাটরা কোনো কক্ষের অধিকারে পৌঁছায়, তবে ট্রাম্পের বাকি শাসনকাল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বিশেষ করে সেনেট ও হাউসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পরিবর্তিত হলে, ট্রাম্পের বিদেশ নীতি ও বাজেট সংশোধনের ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাবে।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ রব গডফ্রে উল্লেখ করেছেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল চিরস্থায়ী যুদ্ধের অবসান, আর ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত তার মূল সমর্থকদের বিরক্ত করতে পারে। গডফ্রের মতে, যদি ট্রাম্প ইরানকে সরাসরি লক্ষ্য করেন, তবে তার বেসের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বাড়তে পারে, যা নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলবে।
ট্রাম্পের সমর্থকরা গত মাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে মত প্রকাশ করলেও, ইরানের মতো শক্তিশালী দেশের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি ও প্রতিরোধের মাত্রা অনেক বেশি। ভেনেজুয়েলায় দ্রুত জয়লাভের প্রত্যাশা ছিল, তবে ইরানের সামরিক ক্ষমতা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করলে একই কৌশল কার্যকর হবে না।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ২০০৩ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ইরাক আক্রমণ করেন, তখন তার লক্ষ্য স্পষ্ট ছিল গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস; বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয় এবং তা ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলছে। এই তুলনা ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের কৌশলগত জটিলতা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি উভয়ই তুলে ধরেছে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্র নীতি ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক উদ্বেগকে অগ্রাধিকার দিয়ে যদি তিনি ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারেন, তবে ইরান সংক্রান্ত সামরিক সিদ্ধান্তের ঝুঁকি কমে যাবে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে পার্টির অবস্থান শক্তিশালী হবে।



