ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গতকাল একটি নৌযানে গুলিবর্ষণ চালায়, যার ফলে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক পোস্টে প্রকাশিত হয় এবং তৎক্ষণাৎ আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে উঠে আসে। নৌযানটি মাদক পাচার কার্যক্রমে জড়িত বলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দাবি করে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী পোস্টে উল্লেখ করেছে যে লক্ষ্যবস্তু নৌযানটি অবৈধ মাদক পরিবহনকারী হিসেবে শনাক্ত হয়েছিল এবং তা থামাতে গুলি চালানো হয়। নৌযানের সুনির্দিষ্ট রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও মালিকানা সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে দাবি করা হয়েছে যে এটি লাতিন আমেরিকায় মাদক সরবরাহের অংশ।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই দাবির সত্যতা যাচাই করার জন্য তৎক্ষণাৎ কোনো স্বতন্ত্র সূত্র পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটির স্বভাব এবং পূর্বে একই অঞ্চলে ঘটিত অনুরূপ আক্রমণের পটভূমি বিবেচনা করে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সেপ্টেম্বর মাস থেকে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যারিবীয় সাগরে সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারী নৌযানগুলোর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান চালিয়ে আসছে। এই অভিযানগুলোকে ‘সফল’ বলে সরকারী সূত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং প্রতিটি আক্রমণে লক্ষ্যবস্তু নৌযানকে ধ্বংসের দাবি করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লাতিন আমেরিকার উপকূলীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং পশ্চিম উপকূলের নিকটবর্তী জলে মাদক পাচার রুটগুলোকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও নৌযান ধ্বংসের সংখ্যা বাড়ছে।
ট্রাম্পের মাদকবিরোধী নীতি অনুসারে ভেনেজুয়েলা সরকারকে অন্তর্ভুক্ত করে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম উপকূলে ৩০টিরও বেশি নৌযানে আঘাত হেনেছে। ভেনেজুয়েলা সরকার এই আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধ বাড়িয়ে তুলেছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের মতে, এই নৌযানগুলো থেকে সরবরাহিত মাদক যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই মাদক চোরাচালান বন্ধের জন্য সামরিক হস্তক্ষেপকে অপরিহার্য বলে তারা যুক্তি দেয়। তবে এই যুক্তি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনার মুখে পড়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর আক্রমণে শতাধিক সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারী নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যার স্বচ্ছতা ও মৃতদের পরিচয় প্রকাশে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
মার্কিন সরকার এই আক্রমণগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বৈধ বলে দাবি করে, তবে বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এই কার্যক্রমকে অবৈধ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তারা যুক্তি দেন যে, কোনো স্বীকৃত আদালতের অনুমোদন ছাড়া লক্ষ্যবস্তু নৌযানে গুলি চালানো আন্তর্জাতিক নীতির লঙ্ঘন।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “ক্যারিবীয় সাগরে সামরিক হস্তক্ষেপের পরিসর বাড়লে অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং মাদক সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।” এই মতামতটি যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সামরিক নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
সংযুক্ত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিভাগ ইতিমধ্যে এই ধরনের আক্রমণকে তদন্তের আওতায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মানদণ্ড মেনে চলতে urged করেছে। ভবিষ্যতে কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা কূটনৈতিক আলোচনা চালু হতে পারে।
ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদক পাচার মোকাবিলার জন্য সামরিক পদ্ধতি ব্যবহার করা কি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে তীব্র মনোযোগ ও সমন্বিত কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।



