লালন ভক্তদের একটি গোষ্ঠী শনিবার প্রকাশিত খোলা চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সম্বোধন করে দোল পূর্ণিমা উৎসবের নিরাপত্তা ও আখড়াবাড়ি সুরক্ষার জন্য আটটি নির্দিষ্ট দাবি উপস্থাপন করেছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে ৩ মার্চ পবিত্র দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে লালনের আখড়াবাড়ি সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। ভক্তরা দাবি করেন যে এই অনুষ্ঠানগুলোকে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য সরকারী দিক থেকে ত্বরিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
দোল পূর্ণিমা লালন সঙ্গীত ও বাউল সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন, যেখানে সারা দেশে বাউল গায়ক, সাধু ও ভক্তরা একত্রিত হয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত, নৃত্য ও আখড়ার নৃত্য‑গান উপভোগ করেন। লালন শাহের জীবদ্দশায় এই অনুষ্ঠানগুলো আখড়াবাড়িতে অনুষ্ঠিত হতো, এবং আজও বহু আখড়াবাড়ি ঐতিহ্যবাহী রীতি বজায় রাখে। ভক্তদের মতে, ধর্ম‑বর্ণ‑জাতি‑গোত্র নির্বিশেষে মানুষ এই পূর্ণিমা উদযাপন করে, তাই নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দিক থেকে কোনো অবহেলা সহ্য করা যাবে না।
চিঠিতে মোট আটটি দাবি উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, আখড়াবাড়ি সুরক্ষা, হিংসা ও কটূক্তি প্রতিরোধ, স্বাধীন চলাচল নিশ্চিতকরণ, সমন্বয় কমিটি গঠন, সাধু কল্যাণ তহবিলের প্রস্তাব এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি দাবি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রথম দাবি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার দিকে কেন্দ্রীভূত। লালন তিরোধান দিবস, দোল পূর্ণিমা এবং অন্যান্য সাধুতিথিতে যথাযথ নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে আখড়াবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ মাজারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পর্যাপ্ত সংখ্যা ও সরঞ্জাম স্থাপন করা জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় দাবিতে আখড়াবাড়ি সুরক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ছেউড়িয়ায় নিবন্ধিত আখড়াগুলোর আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং কোনো ধরনের দখল, হয়রানি বা বাধা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে কিছু প্রতিষ্ঠানকে নতুন নিবন্ধন আওতায় আনতে হবে বলে সুপারিশ করা হয়েছে।
তৃতীয় দাবি হিংসা ও কটূক্তি প্রতিরোধের জন্য কঠোর আইনগত পদক্ষেপের দাবি করে। বাউল ও সাধুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, অপপ্রচার বা সামাজিক উস্কানির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাগল‑মস্তান‑সন্ন্যাসী‑বাউলদের জীবনে আঘাত হানার যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে দাবি করা হয়েছে।
চতুর্থ দাবি সাধু সংস্কৃতি রক্ষার্থে স্বাধীন চলাচলের নিশ্চয়তা দেয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় সাধুদের যাতায়াত ও অনুষ্ঠান পরিচালনায় প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো বাধা বা অনধিকারিক হস্তক্ষেপ না হয়।
পঞ্চম দাবি একটি সরকারী সমন্বয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও লালন সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি তদারকি কমিটি গঠন করে আখড়াবাড়ি পরিচালনা ও অনুষ্ঠান সমন্বয় করা হবে। এছাড়া বয়োজ্যেষ্ঠ ও খেলাফতি সাধুদের নিয়ে আখড়াবাড়ি পরিচালনা কমিটি গঠন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠ দাবি সাধু কল্যাণ তহবিলের প্রতিষ্ঠা নিয়ে। প্রবীণ ও অসচ্ছল সাধুদের জন্য স্বাস্থ্য সহায়তা, মৌলিক কল্যাণমূলক সহায়তা এবং জরুরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তদুপরি, ছেউড়িয়ায় লালন একাডেমীর শিল্পী ও সাধুদের জন্য বিশেষ সহায়তা পরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সপ্তম দাবি আখড়াবাড়ি ও লালন সংস্থার কার্যক্রমে সরকারি তহবিলের বরাদ্দের প্রস্তাব দেয়। সংস্কৃতি ও পর্যটন উন্নয়নের অংশ হিসেবে আখড়াবাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও আধুনিকায়নের জন্য আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা হবে বলে দাবি করা হয়েছে।
অষ্টম এবং শেষ দাবি সকল সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগের মাধ্যমে সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানায়। ভক্তরা উল্লেখ করেন যে, সরকারের সদয় দৃষ্টি ও দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে দোল পূর্ণিমা উৎসব নিরাপদে ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে এবং লালন সঙ্গীতের ঐতিহ্য সংরক্ষিত থাকবে। এই চিঠি লালন ভক্তদের ঐক্যবদ্ধ চেতনা ও সংস্কৃতি রক্ষার দৃঢ় সংকল্পকে প্রকাশ করে, এবং সরকারকে এই দায়িত্বে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে আহ্বান জানায়।



