মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের বেশ কিছু শুল্ক ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে। এই পরিবর্তনের পর, মার্কিন সরকার সব দেশকে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছে। ফলে, বাংলাদেশে বিদ্যমান ১৬.৫ শতাংশ শুল্কের ওপর অতিরিক্ত ২৬.৫ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হতে পারে, যা মোট শুল্কের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সেক্রেটারি, WTO শাখার খাদিজা নাজনীন এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেছিলেন, “প্রথমে আমরা চুক্তিটি বিশদে পর্যালোচনা করব, তারপর সিদ্ধান্ত নেব।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে একটি প্রস্থান ধারা রয়েছে, যা অন্য কোনো দেশের চুক্তিতে নেই। এই ধারা ব্যবহার করে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।
খাদিজা নাজনীন চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চুক্তিতে প্রস্থান ধারা রয়েছে, অন্য কোনো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চুক্তিতে এমন ধারা নেই। সুতরাং, আমরা সরকারী নীতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।” তিনি চুক্তি স্বাক্ষরের বিশদে অতিরিক্ত মন্তব্য না করে, রায়ের সরাসরি প্রভাব সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আরেকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ না করে কথা বলেছেন, রায়ের ফলে পুরো চুক্তি বাতিল হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এখন আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নেব। পুরো চুক্তি বাতিলের সম্ভাবনা রয়েছে, তাই আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, চুক্তির কার্যকারিতা এখন অনিশ্চিত।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফেব্রুয়ারি ৯ তারিখে আমেরিকান রিসিপ্রোকাল ট্রেড (ART) চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে পারস্পরিক শুল্ক হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছিল। এই চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে রপ্তানির প্রধান গন্তব্য। তবে ট্রাম্প সরকারের সময় এই চুক্তি একতরফা শর্তে স্বাক্ষরিত হওয়ায় দেশীয় বিশ্লেষক ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কাছ থেকে সমালোচনা পাওয়া যায়।
মার্কিন সরকার ২ এপ্রিল গত বছর জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে রিসিপ্রোকাল শুল্ক আরোপের ভিত্তি তৈরি করেছিল। প্রথমে ৩৭ শতাংশ শুল্কের পরিকল্পনা ছিল, যা পরে ধাপে ধাপে কমিয়ে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কে রূপান্তরিত হয়। এই শুল্ক নীতি বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের মূল্যে প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে পোশাক, জুয়ালারি ও চামড়া পণ্যের ক্ষেত্রে।
শুল্ক বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি শিল্পে মার্জিন সংকুচিত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দেবে। একই সঙ্গে, শুল্কের অতিরিক্ত বোঝা ভোক্তা মূল্যের ওপরও প্রভাব ফেলবে, যা দেশের মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখন চুক্তির প্রস্থান ধারা ব্যবহার করে, শুল্কের অতিরিক্ত বোঝা কমানোর জন্য বিকল্প পথ অনুসন্ধান করছে। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে অন্যান্য বাজারে প্রবেশ, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি পুনর্বিবেচনা এবং শুল্কের পরিবর্তে অ-শুল্কমূলক সুবিধা চাওয়া অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি চুক্তি বাতিল হয় এবং শুল্কের হার বাড়ে, তবে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরে রপ্তানি আয় ১০-১৫ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা শিল্পের কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ওপর চাপ বাড়াবে।
অন্যদিকে, সরকারী সূত্রে জানানো হয়েছে, চুক্তির প্রস্থান ধারা ব্যবহার করে নতুন শর্তে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি নতুন শর্তে শুল্ক হ্রাস করা যায়, তবে রপ্তানি শিল্পের উপর নেতিবাচক প্রভাব কমে আসতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ার সময়সীমা ও শর্তাবলী এখনও স্পষ্ট নয়।
সারসংক্ষেপে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং মার্কিন সরকারের অতিরিক্ত শুল্কের ঘোষণার ফলে বাংলাদেশকে তার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। শুল্কের সম্ভাব্য বৃদ্ধি রপ্তানি শিল্পের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে, তবে চুক্তির প্রস্থান ধারা ব্যবহার করে সরকার বিকল্প কৌশল গড়ে তুলতে পারে। ভবিষ্যতে শুল্কের পরিমাণ, চুক্তির অবস্থা এবং বিকল্প বাজারের অনুসন্ধান দেশের বাণিজ্য নীতির মূল দিক হয়ে থাকবে।



