শীতের মাসগুলোতে বাংলাদেশে বিবাহ, অফিস গালা ও জাতীয় অনুষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই উৎসবগুলোতে ফুলের চাহিদা তীব্রভাবে বাড়ে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে প্রথম ফাল্গুন, ভ্যালেন্টাইন ডে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সমন্বয়ে রঙিন সাজসজ্জা দেখা যায়।
ফুলের চাহিদা শুধুমাত্র সাজসজ্জার জন্য নয়, বরং শোক ও স্মরণ অনুষ্ঠানেও অপরিহার্য। তাই প্রতিটি উৎসবের আগে টন টনের ফুলের অর্ডার বাজারে প্রবাহিত হয়। এই চাহিদা পূরণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উৎপাদকদের সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খল কাজ করে।
প্রায় দুইশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সরবরাহ পথটি গডখালী ইউনিয়ন, যশোর থেকে ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। ৪৩ বছর আগে কয়েকজন কৃষকই এই রুটটি প্রথমে চিহ্নিত করেন; তখন থেকে এটি ধীরে ধীরে জাতীয় স্তরে ফুলের প্রধান লজিস্টিক নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত হয়েছে।
এই রুটের মূল চালিকাশক্তি ছিল শার আলি সরদার, যাকে দেশের প্রথম বাণিজ্যিক ফুল চাষী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তার পিতা আবদুর রহমান সরদার একটি ফল ও কাঠের চারা নর্সারি পরিচালনা করতেন, যেখানে শার আলি শৈশব থেকে কাজ শিখেছিলেন। তবে ফুলের ব্যবসা তখনো পরিবারের মূল কার্যক্রম ছিল না।
১৯৮২ সালের এক বিকেলে গডখালীর নর্সারিতে একটি অচেনা ব্যক্তি জল চেয়ে থামেন। তার হাতে টিউবেরোসের কয়েকটি ডাঁটা ছিল, এবং তিনি নিজেকে জশোর সদর থেকে নূর ইসলাম বলে পরিচয় দেন। আলি তার সঙ্গে কথা বলার পর টিউবেরোসের ১০০ কেজি বাল্ব সংগ্রহ করে এক বিঘার কম জমিতে রোপণ করেন।
এই ছোট উদ্যোগের ফলাফল দ্রুতই স্থানীয় কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। টিউবেরোসের ফসলের উচ্চ ফলন ও বাজারমূল্য আলির কৃষিকাজকে লাভজনক করে তুলেছিল, ফলে আশেপাশের বহু পরিবারই ফ্লোরিকালচার শাখায় প্রবেশ করে। এই পরিবর্তন জশোরের কৃষি প্রোফাইলকে ফুল উৎপাদনের দিকে সরিয়ে দেয়।
আলির উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঢাকা শহরের শাহবাগ ও বেইলি রোডের ফুলের চাহিদা পূরণে রপ্তানি শুরু করেন। শহরের উচ্চমানের ইভেন্ট ও হোটেলগুলোতে তার ফুলের গুণগত মান দ্রুত স্বীকৃতি পায়, যা তার ব্যবসাকে আরও বিস্তৃত বাজারে পৌঁছাতে সহায়তা করে।
ঢাকায় প্রথম বিশেষ ফুলের বাজার হিসেবে মালঞ্চা গড়ে ওঠে, যেখানে আলির মতো পাইলট চাষীরা সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে লেনদেন করতে পারেন। এই বাজারের প্রতিষ্ঠা ফুলের লজিস্টিক খরচ কমিয়ে দেয় এবং বিক্রয় চ্যানেলকে স্বচ্ছ করে। ফলে মৌসুমী চাহিদা মেটাতে দ্রুত সরবরাহ সম্ভব হয়।
বাজারের সম্প্রসারণের ফলে ফুলের মূল্য মৌসুমে উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করে। শীতের উৎসবের শীর্ষে দাম বাড়লেও, অফ-সিজনে অতিরিক্ত স্টক বিক্রির জন্য মূল্য কমে যায়। এই চক্রাকার মূল্য পরিবর্তন চাষী ও পরিবহনকারী উভয়ের জন্যই ঝুঁকি ও সুযোগ উভয়ই তৈরি করে।
ফুলের উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল এখন দেশের বিভিন্ন অংশে বিস্তৃত, তবে যশোরের গডখালী রুট এখনও মূল হাব হিসেবে কাজ করে। এই রুটের মাধ্যমে প্রতি বছর টন টনের ফুল ঢাকায় পৌঁছে, যা স্থানীয় ইভেন্ট, হোটেল ও রেস্টুরেন্টের চাহিদা পূরণ করে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, শীতের উৎসবের ধারাবাহিকতা ও নতুন উদযাপন (যেমন ভ্যালেন্টাইন ডে) ফুলের চাহিদা বাড়িয়ে তুলবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও রোগের ঝুঁকি উৎপাদন খরচ বাড়াতে পারে। তাই চাষীরা উচ্চ ফলনশীল জাতের গবেষণা ও আধুনিক সেচ পদ্ধতিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন।
সংক্ষেপে, গডখালী‑ঢাকা সরবর



