২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও মহান শহীদ দিবসের উপলক্ষে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বাংলা ভাষায় শুভেচ্ছা জানিয়ে দেশের জনগণের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। তিনি জাতীয় শোকের দিনটি স্মরণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে, “ভাষা আমাদের সংস্কৃতির পরিচয়” বলে তার বক্তব্যের মূল সুর তুলে ধরেছেন। এই বার্তা মার্কিন সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক বন্ধুত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সংযোগের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেনের ভাষণটি ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে, ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ঘটনার গুরুত্বকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেছে। তিনি উল্লেখ করেন, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদেরকে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে, নিজস্ব ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করে। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দিনটি উদযাপন করার মাধ্যমে দুই দেশের সাংস্কৃতিক সংহতি জোরদার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সকালবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকের চিহ্নে উপস্থিত হয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মানসূচক পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। তার বক্তৃতায় তিনি ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে মাতৃভাষার ভূমিকা তুলে ধরেন। এরপর তিনি সরকারী মন্ত্রিসভার সদস্য ও বিরোধী দলীয় নেতাদের সঙ্গে এক মুহূর্ত নীরবতা বজায় রেখে শহীদদের স্মৃতি স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর পর, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, বিরোধী দলীয় নেতা এবং তিনটি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানগণও পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে একত্রে শোক প্রকাশ করেন। এই অনুষ্ঠানে বিদেশি কূটনীতিক, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন, যা আন্তর্জাতিক সমর্থনের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। সকল অংশগ্রহণকারী একসাথে ভাষা শহীদদের স্মৃতিতে নীরবতা বজায় রেখে ঐতিহাসিক মুহূর্তকে সম্মানিত করেন।
সরকারি আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর শহীদ মিনার সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ভোরবেলায় বিভিন্ন পেশা ও বয়সের মানুষ, হাতে ফুল ও শূন্য পায়ে, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গানের সুরে ধীরে ধীরে মিনারে সমাবেশিত হন। তারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করে, ভাষা শহীদদের ত্যাগকে স্মরণ করে এবং মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেন।
ঢাকার পাশাপাশি দেশের প্রতিটি জেলা ও বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতেও আজকের দিনটি যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয়। বিভিন্ন স্থানীয় সরকার ও সমাজ সংগঠনগুলোও শহীদ মিনারে সমাবেশ করে, ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এই বিস্তৃত উদযাপন দেশব্যাপী একতা ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাংলা ভাষায় শুভেচ্ছা প্রদান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মাতৃভাষা দিবসের গুরুত্বকে বাড়িয়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য মিশনও একই দিনে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সমন্বিত বার্তা প্রকাশ করেছে, যা বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক সংলাপের একটি উদাহরণ। এই ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সফট পাওয়ার বাড়াতে সহায়ক বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভাষা ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুক্তরাষ্ট্রের এই শুভেচ্ছা বাংলাদেশে মানবিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগকে শক্তিশালী করে, যা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। একইসাথে, বাংলাদেশ সরকারও আন্তর্জাতিক মঞ্চে মাতৃভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতি পেতে এবং তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
মার্কিন সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক সংলাপের অংশ হিসেবে, এই সাংস্কৃতিক ইভেন্টটি দুই দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার নতুন মাত্রা উন্মোচন করেছে। ভবিষ্যতে উভয় পক্ষের মধ্যে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও সমন্বিত প্রকল্পের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, যা ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণে সহায়ক হবে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই উদযাপনকে কেন্দ্র করে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশও তাদের নিজস্ব ভাষা সংরক্ষণে পদক্ষেপ গ্রহণের কথা প্রকাশ করেছে। এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগগুলো অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উপলক্ষে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের বাংলা শুভেচ্ছা, দেশের শীর্ষ নেতাদের শোক ও সম্মানসূচক অনুষ্ঠান, এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বিস্তৃত উদযাপন, সকলই ভাষা শহীদদের ত্যাগকে স্মরণ করার পাশাপাশি দুই দেশের কূটনৈতিক বন্ধুত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে। এই দিনটি ভবিষ্যতে আরও বেশি সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত হবে।



