বিশ্বে আজ প্রায় সাত হাজারের বেশি ভাষা ব্যবহার করা হয়, তবে তাদের ব্যবহারকারীর বণ্টন অত্যন্ত অসম। মোট জনসংখ্যার প্রায় সত্তানব্বই শতাংশ মাত্র চার শতাংশ ভাষায় কথা বলে।
ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ভাষা বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে এবং প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা নিঃশেষ হয়ে যায়। এই হারকে যদি গাণিতিকভাবে ধরা হয়, তবে প্রতি বছর প্রায় দুই-তিনশো ভাষা হারিয়ে যায়।
ভাষা হারিয়ে যাওয়া শুধু শব্দের ক্ষতি নয়, এটি ঐ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, জ্ঞানভাণ্ডার এবং পরিচয়ের ক্ষতিও বয়ে আনে, যা একুশ শতকের সবচেয়ে জরুরি সাংস্কৃতিক সংকটের মধ্যে গণ্য হয়।
বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষাকে জাতীয় গর্ব ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত হয়।
তবে এই শক্তিশালী জাতীয় বর্ণনা দেশের অভ্যন্তরীণ ভাষাগত বৈচিত্র্যকে প্রায়শই উপেক্ষা করে। চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টসের বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভাষা, যার মধ্যে হ্যো ভাষাও অন্তর্ভুক্ত, এ ধরনেরই এক উদাহরণ।
হ্যো, যা স্থানীয়ভাবে নিজস্ব নাম, এক্সোনিম হিসেবে খিয়াং নামে পরিচিত, এবং এটি গবেষকের দুই দশকের গবেষণার বিষয়বস্তু। এই সময়কালে ভাষার গঠন, ব্যবহার এবং সম্প্রদায়ের সামাজিক অবস্থার উপর বিশদ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
২০২২ সালের জনসংখ্যা ও গৃহস্থালি জরিপে হ্যো ভাষাভাষীর সংখ্যা ৪,৮২৬ হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। এই সংখ্যা ছোট হলেও, ভাষাটির অস্তিত্ব ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হ্যো ভাষা চীন জাতির একটি উপগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত, যা দক্ষিণ-মধ্য (পূর্বে কুকি-চিন) শাখার টিবেটো-বার্মার ভাষা পরিবারে অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবারে অন্যান্য বহু ভাষা রয়েছে, যা পারস্পরিক সাদৃশ্য ও পার্থক্য উভয়ই ধারণ করে।
ভৌগোলিকভাবে হ্যো প্রায় একত্রিশটি গ্রামে ছড়িয়ে রয়েছে, যা চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টসের তিনটি জেলা এবং চট্টগ্রাম ও বান্দরবনের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। এই গ্রামগুলোতে ভাষার ব্যবহার দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
হ্যো ভাষার দুটি উপভাষা রয়েছে: লাইতু এবং কংটু। লাইতু নিম্নভূমিতে, আর কংটু উচ্চভূমিতে প্রচলিত, এবং তাদের মধ্যে পার্থক্য মূলত স্বর ও কিছু শব্দভাণ্ডারে সীমিত।
এই দুটি উপভাষা এক বৃহত্তর ভাষা ধারার অংশ, যা চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস থেকে মিয়ানমারের চীন ও রাখাইন রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ধারার মাধ্যমে ভাষা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সংযোগ স্পষ্ট হয়।
লাইতু নামের একটি ভাষা মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন থেকে সিট্টু পর্যন্ত প্রায় বিশ দুইটি গ্রামে ব্যবহৃত হয়, যা হ্যো ভাষার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য শেয়ার করে।
ভাষা সংরক্ষণের জন্য ডকুমেন্টেশন, স্থানীয় শিক্ষার সমর্থন এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই ভাষার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রয়ে যায়।
পাঠকগণ যদি স্থানীয় ভাষা সংরক্ষণে অবদান রাখতে চান, তবে প্রথমে তাদের কাছের হ্যো ভাষাভাষী সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে মৌলিক শব্দ ও অভিব্যক্তি শিখতে পারেন। এছাড়া ভাষা সংরক্ষণে কাজ করা সংস্থার কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণ করা একটি ব্যবহারিক উপায়।



