ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর পার হওয়ার পরেও শহীদ আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম এবং শফিউর রহমানের স্মৃতিসৌধ ও সংগ্রহশালাগুলো যথাযথ যত্ন পায়নি। তিনজনের পরিবার ও সমর্থকরা দীর্ঘদিন ধরে সঠিক স্মারক গড়ে তোলার দাবি জানাচ্ছেন, তবে বর্তমান অবস্থা অবহেলার চিহ্ন বহন করে। এই পরিস্থিতি ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
আবদুল জব্বার ১৯৫২ সালে শহীদ হয়ে যাওয়ার পর তার পরিবার গফারগাঁওয়ের পঞ্চুয়া গ্রামে না থেকে হালুয়াঘাটের শিমুলকুচিতে বসতি স্থাপন করে। শহীদের আত্মীয়রা শিমুলকুচিতে একটি স্মারক গৃহের দাবি করে, তবে ২০০৮ সালে জেলা পরিষদ পঞ্চুয়ায় একটি লাইব্রেরি ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে। এই স্মৃতিসৌধে জব্বারের কোনো ব্যক্তিগত সামগ্রী রাখা হয়নি, ফলে দর্শনার্থীরা প্রায়ই খালি হাতে ফিরে যান।
পঞ্চুয়ার স্মৃতিসৌধের পাশে গড়ে ওঠা লাইব্রেরিতে প্রায় চার হাজার বই সংরক্ষিত, এবং প্রতি বছর শহীদ দিবসে এখানে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। তবে শিবিরের মূল আকর্ষণ—শহীদ জব্বারের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের অনুপস্থিতি—দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ। পরিবার ও সমর্থকরা এখনো শিমুলকুচিতে একটি প্রকৃত জাদুঘরের জন্য অনুরোধ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ফেনির সালামনগরে অবস্থিত আবদুস সালামের স্মৃতিসৌধ লাইব্রেরি বর্তমানে শূন্য অবস্থায় রয়েছে। শহীদকে সমর্পিত রক্তমাখা শার্ট ও ফটোগ্রাফগুলো বহু বছর আগে চুরি হয়ে গিয়েছে, ফলে কেবল একটি হাতে অঙ্কিত প্রতিকৃতি বাকি আছে। লাইব্রেরির তাকগুলো ফাঁকা, এবং স্থানীয় মানুষদের কাছে এই স্মৃতিস্তম্ভের গুরুত্ব কমে গেছে।
ঢাকার শফিউর রহমানের ক্ষেত্রে অবস্থা আরও বেশি অবহেলাপূর্ণ। তার নামে কোনো জাদুঘর বা স্মারক গৃহ গড়ে ওঠেনি; সাম্প্রতিক সময়ে একমাত্র স্বীকৃতি হল তার নামে একটি রাস্তা অনুমোদন করা হয়েছে। শফিউরের কিছু ফটোগ্রাফ বাংলা একাডেমীর সংরক্ষণাগারে সংরক্ষিত, তবে তা ছাড়া অন্য কোনো স্মারক নেই।
তিনজন শহীদের স্মৃতিস্তম্ভের বর্তমান অবস্থা একটি সাধারণ প্রবণতা প্রকাশ করে: সংগ্রহশালায় মূল সামগ্রী অনুপস্থিত, স্মারকগুলো অবহেলায় ভুগছে, এবং পরিবারগুলো আর্থিক ও মানসিক চাপে আছেন। সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও যথাযথ স্মারক গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ এখনও বাস্তবে রূপ পায়নি।
এই অবহেলা ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে ক্ষয় করে। ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের ত্যাগকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যথাযথ স্মারক ও সংগ্রহশালা অপরিহার্য। স্মৃতিস্তম্ভের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না হলে শহীদদের ত্যাগের মূল্য কমে যাবে এবং জাতীয় গর্বের ভিত্তি দুর্বল হবে।
স্থানীয় সমাজের জন্য এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের মূল স্তম্ভ। স্মারকগুলোর অবহেলা কেবল ঐতিহাসিক তথ্যের ক্ষতি নয়, বরং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জাতীয় গর্বের হ্রাস ঘটাতে পারে।
অতএব, স্মৃতিস্তম্ভের রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যক্তিগত সামগ্রীর সংরক্ষণ এবং পরিবারগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকৃত স্মারক গঠন করা জরুরি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত শহীদদের পরিবারের চাহিদা শোনার পাশাপাশি যথাযথ তহবিল ও পরিকল্পনা নিশ্চিত করা।
স্মৃতিস্তম্ভের অবহেলা দূর করতে স্থানীয় নাগরিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সংস্কৃতি সংস্থাগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। একবার সঠিকভাবে গড়ে তোলা স্মারক ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভাষা আন্দোলনের ত্যাগের সত্যিকারের অর্থ উপলব্ধি করতে সহায়তা করবে।
ভাষা শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে এই ধরণের উদ্যোগের অভাব না থাকলে জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব হবে না, এবং ভাষা আন্দোলনের সাফল্যকে ভবিষ্যতে পুনরায় উদযাপন করা সহজ হবে।



