একজন ম্রো কিশোরের সৃষ্ট ম্রো বর্ণমালা এখন গুগল প্লে স্টোরে কী-বোর্ডের রূপে ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। এই ডিজিটাল সরঞ্জামটি ১৬ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে গুগল প্লে স্টোরে প্রকাশিত হয় এবং নাম রাখা হয়েছে ‘ইউবোর্ড’। এর মাধ্যমে ম্রো ভাষাভাষীরা এখন স্মার্টফোনে সহজে নিজের মাতৃভাষায় লিখতে পারবে।
ম্রো ভাষা ঐতিহ্যগতভাবে মৌখিকভাবে সংরক্ষিত ছিল এবং কাগজে-কলমে লেখার জন্য কোনো মানক অক্ষরভাণ্ডার ছিল না। ১৯৮০-এর দশকে একটি ম্রো কিশোরের উদ্যোগে প্রথম ম্রো বর্ণমালা গড়ে ওঠে, যা তখনই গ্রাম্য বিদ্যালয় ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সীমিতভাবে ব্যবহার করা হতো। বছরের পর বছর এই অক্ষরগুলো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলেও সম্প্রতি ডিজিটাল জগতে স্থান পেয়েছে।
বর্ণমালার স্রষ্টা হলেন বান্দরবান সদর উপজেলার টংকাবতি ইউনিয়নের চিম্বুক পাহাড়ের ক্রামাদি পাড়ার বাসিন্দা মেনলে ম্রো। স্থানীয়ভাবে তাকে ‘ক্রামাদি মেনলে’ নামেও ডাকা হয়। তার নামেই ক্রামাদি পাড়ার নামকরণ করা হয়েছে, যা তার অবদানের প্রতীক।
ম্রো ভাষা সহ অন্যান্য বিপন্ন ভাষার জন্য সরকারী আইসিটি বিভাগে একটি বিশেষ উদ্যোগ চালু হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল ভাষা প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিপন্ন ভাষাগুলোকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করা। এ কাজের অংশ হিসেবে গুগল প্লে স্টোরে স্থানীয় ভাষার কী-বোর্ড যুক্ত করা হয়।
প্রথম ধাপে চারটি ভাষা—চাকমা, মারমা, ম্রো ও সাঁওতালি—গুগল প্লে স্টোরে যুক্ত করা হয়। এই ভাষাগুলোর জন্য আলাদা কী-বোর্ড লে-আউট তৈরি করা হয়, যাতে ব্যবহারকারীরা স্বাভাবিকভাবে টাইপ করতে পারে। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও দুটি ভাষা—মাহালি ও মাল্টো—ডিজিটাল কী-বোর্ডে যুক্ত করা হয়।
এই কাজের সমন্বয়কারী ছিলেন ফ্রেন্ডস অব এনডেঞ্জার এথনিক ল্যাংগুয়েজ (ফিল) সংস্থার ভাষা প্রযুক্তিবিদ সমর এন সরেন। তিনি বহু বছর ধরে দেশের বিপন্ন ভাষা নিয়ে প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি করছেন। ফিলের পূর্ববর্তী প্রকল্পে খেয়াং ভাষার বর্ণমালা কম্পিউটারে যুক্ত করা ছিল।
সমর এন সরেনের মতে, ম্রো বর্ণমালার কী-বোর্ড ডেভেলপমেন্টে তিনি তিন বছর কাজ করেছেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে সরকারী আইসিটি বিভাগ এই প্রকল্পকে গুগল প্লে স্টোরে প্রকাশের অনুমতি দেয়। ‘ইউবোর্ড’ নামের এই অ্যাপটি এখন ছয়টি ভাষা—চাকমা, মারমা, ম্রো, সাঁওতালি, মাহালি ও মাল্টো—কে সমর্থন করে।
গুগল প্লে স্টোরে ‘ইউবোর্ড’ ডাউনলোড করলে ব্যবহারকারী সহজে এই ভাষাগুলোতে টেক্সট লিখতে পারে। অ্যাপটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লে-আউট পরিবর্তন করে, ফলে অক্ষরগুলো সঠিক ক্রমে প্রদর্শিত হয়। এই সুবিধা গ্রাম্য জুমচাষি, শিক্ষার্থী ও লেখকদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।
ডিজিটাল কী-বোর্ডের উপস্থিতি ম্রো ভাষাভাষীদের জন্য নতুন প্রকাশের পথ খুলে দিয়েছে। এখন তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, ব্লগে ও ই-কমার্সে নিজের ভাষায় পোস্ট করতে পারে। পাশাপাশি, স্থানীয় প্রকাশকরা ম্রো বর্ণমালায় রীতিমত বই ও সাময়িকী প্রকাশের পরিকল্পনা করছে।
ভাষা বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, পৃথিবীর প্রতিদিন একটি করে ভাষা নিঃশেষের পথে ধাবিত হয়। ম্রো ভাষার মতো ক্ষুদ্র ভাষার টিকে থাকা এখন প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। গুগল প্লে স্টোরে এই কী-বোর্ডের সংযোজন ভাষা সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘ইউবোর্ড’ ভবিষ্যতে আরও ভাষা যুক্ত করার সম্ভাবনা রাখে, যা দেশের ভাষা বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করবে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে ভাষা প্রযুক্তি উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে। শেষ পর্যন্ত, ম্রো বর্ণমালা গুগল প্লে স্টোরে পৌঁছানো স্থানীয় জনগণের সাংস্কৃতিক গর্ব ও আত্মবিশ্বাসকে নতুন মাত্রা দেবে।



