পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদান করার দাবি বহু বছর ধরে শোনা যাচ্ছে, তবে বাস্তবে তা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হলেও, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, যথাযথ পাঠ্যবই এবং পাঠদানের সময়সূচি সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় কার্যক্রমে বাধা দেখা দিচ্ছে।
বিতরণকৃত বইগুলো মূলত মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা তিনটি ভাষায় প্রস্তুত করা হয় এবং তিনটি প্রধান গোষ্ঠীর শিশুদের মধ্যে ভাগ করা হয়। তবে শিক্ষকের অভাবের কারণে বইগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক জ্ঞান অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি পাঠ্যবইয়ের ঘাটতি এবং পাঠদানের সময়সূচি না থাকায় মাতৃভাষা শিক্ষার পরিকল্পনা প্রায়ই অস্থির অবস্থায় থাকে। সরকারী উদ্যোগের মুখে এই সমস্যাগুলো সমাধান না হলে, শিশুরা তাদের নিজস্ব ভাষায় সঠিক শিক্ষা পেতে পারবে না।
তবু কিছু সংস্থা ও স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য কেয়াং বা মন্দিরভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হয়েছে। এই কার্যক্রম তিনটি পার্বত্য জেলায় পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে শিশুরা তাদের মাতৃভাষার বর্ণমালায় পরিচিত হতে পারছে।
গত বছর খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলায় একটি ভাষা শিখন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্থানীয় গোষ্ঠীর আবেদন অনুযায়ী উপজেলা প্রশাসন এই কেন্দ্রটি গড়ে তুলেছে, যা সিন্ধুকছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের দূরবর্তী এলাকায় অবস্থিত। এখানে মারমা ও ত্রিপুরা শিক্ষার্থীরা তাদের ভাষা শিখতে পারছে।
খাগড়াছড়ি জেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম জানান, যদিও কিছু শিক্ষক আছে, তবু ভাষা শিক্ষার জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় বই বিতরণ সত্ত্বেও সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৩০ লক্ষ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সমীক্ষা অনুযায়ী দেশে মোট ৪১টি ভাষা রয়েছে, যার মধ্যে ৩৪টি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ভাষা। তবে এই ভাষাগুলোর বেশিরভাগেরই লিখিত রূপ নেই।
লিখিত রূপের অভাবে এই গোষ্ঠীর শিশুরা শুধুমাত্র মৌখিকভাবে ভাষা ব্যবহার করে, ফলে বর্ণমালার জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। অনেকেই এখনও তাদের নিজস্ব বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত নয়, যা ভাষার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
একজন তরুণ লেখক ও কবি উল্লেখ করেন, প্রান্তিকতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, সাংস্কৃতিক আক্রমণ এবং নগরায়নের প্রভাবের ফলে অনেক ভাষা বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে। এই কারণগুলো ভাষা সংরক্ষণে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশে বাংলা ছাড়া বর্তমানে ৩৯টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা বিদ্যমান, যার মধ্যে ১৪টি ভাষা বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে রেংমিতচা ভাষা সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে, যা সংরক্ষণে ত্বরিত পদক্ষেপের প্রয়োজন।
শিক্ষা ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় গোষ্ঠীর জন্য একটি ব্যবহারিক পরামর্শ হল, প্রশিক্ষিত মাতৃভাষা শিক্ষক গঠন এবং যথাযথ পাঠ্যবই সরবরাহের পাশাপাশি শিক্ষার সময়সূচি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা। এভাবে শিশুরা তাদের নিজস্ব ভাষায় গুণগত শিক্ষা পেতে পারবে এবং ভাষা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।



