২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে রাশিয়ার বোমা হামলা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনের লক্ষাধিক সাধারণ মানুষকে এক রাতেই সৈন্যে রূপান্তরিত করা হয়। পূর্বে কখনো অস্ত্র না ধরার অভিজ্ঞতা থাকা নাগরিকরা দ্রুত অস্ত্র হাতে নেয়, এবং চার বছর পর যুদ্ধের তীব্রতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নিয়োগের সংখ্যা বাড়ে। পুরুষদের জন্য ২৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সের মধ্যে সেবা বাধ্যতামূলক, আর নারীরা চুক্তিভিত্তিকভাবে সেবা দিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, যুদ্ধের বিভিন্ন স্তরে—মাটি ভেজা খনন, ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, সামনের পর্যবেক্ষণ পোস্ট এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র—নয়জন ইউক্রেনীয় সৈন্য তাদের পূর্বের জীবন, বর্তমানের সৈনিক পরিচয় এবং যুদ্ধের মানসিক ভার তুলে ধরেছেন। তাদের বর্ণনা থেকে দেখা যায়, যুদ্ধের ধাক্কা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক দিকেও গভীর প্রভাব ফেলে।
একজন সৈন্য, ওলেনা, পূর্বে প্রাগে নাইটক্লাবের প্রশাসনিক কাজ করতেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের আগে তার জীবন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ধারায় ছিল এবং সময়ের পরিমাণ যথেষ্ট ছিল। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি ইউক্রেনে ফিরে এসে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন এবং পাইলটের পদে নিযুক্ত হন। তার পুরনো ছবি দেখলে তিনি নিজেকে শান্ত, কিছুটা নির্দোষ হিসেবে মনে করেন, আর এখন তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্বের জীবনে তিনি সর্বদা সময়মতো পৌঁছানো, সাফল্য অর্জন, উপার্জন এবং স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য দৌড়াতেন। এখন তার একমাত্র লক্ষ্য হল শত্রুর আক্রমণের পরেও তার সহযোদ্ধারা বেঁচে থাকা।
ওলেনার মতে, সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলো বিস্ফোরণ বা সরাসরি বিপদ নয়, বরং ক্ষতির সংবাদ শোনার পরের নীরবতা। তিনি পরিবারকে স্মরণ করে শক্তি পান, যদিও তার পরিবার সপ্তাহে এক দিনও আলো ও তাপ ছাড়া কাটিয়ে থাকে, তবু তারা ভবিষ্যতের আশায় অটল থাকে। যুদ্ধ চলমান থাকলেও তিনি আরেকটি জীবন কল্পনা করতে পারেন না; শত্রু তার বাড়িতে না থাকলে তার স্থান এখানেই থাকবে।
অন্যান্য সৈন্যের মধ্যে রয়েছে ওলেহ, যিনি ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে যুদ্ধের সূচনার সময় বিভ্রান্তি ও ভয় অনুভব করেন। কিছু মানুষ সীমান্তের দিকে পলায়ন করে, আবার অন্যরা নিয়োগকর্তা অফিসে গিয়ে সেবা গ্রহণ করে। ওলেহ স্বীকার করেন, তিনি ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেকে স্থবির অবস্থায় পেলেন। এই ধরনের অভিজ্ঞতা ইউক্রেনের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাধারণ, যেখানে যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে অজানা ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশাল মানসিক চাপ দেখা গিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, রাশিয়ার আক্রমণ ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্বিবেচনা ত্বরান্বিত করেছে। ন্যাটো সদস্য দেশগুলো সামরিক সহায়তা বাড়িয়ে এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও মানবিক সাহায্য, আর্থিক সহায়তা এবং শরণার্থী সমর্থনের মাধ্যমে সংঘাতের প্রভাব কমাতে কাজ করছে। এক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, ইউক্রেনের নাগরিকদের দ্রুত সৈন্যে রূপান্তর দেশীয় রিজার্ভ শক্তি বাড়িয়ে দেয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক কাঠামোর উপর চাপ সৃষ্টি করে।
যুদ্ধের চার বছর পর, ইউক্রেনের সামরিক নীতি আরও কঠোর হয়েছে; পুরুষদের জন্য সেবার সময়সীমা অনির্দিষ্ট, আর নারীদের জন্য চুক্তিভিত্তিক সেবা বাড়ানো হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো দেশের জনসংখ্যা গঠনে প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং পারিবারিক জীবনে। একই সঙ্গে, শরণার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং ইউরোপীয় দেশগুলো শরণার্থী গ্রহণে সমন্বিত নীতি গড়ে তুলছে।
ভূগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে, রাশিয়ার আক্রমণ পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি করেছে, যা ন্যাটো এবং রাশিয়ার মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। ভবিষ্যতে, শীতকালীন শীতের পরবর্তী মাসগুলোতে ইউক্রেনের সামরিক অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে, শীতের কঠিন পরিস্থিতিতে সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখা এবং শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতা যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।
সামগ্রিকভাবে, রাশিয়ার বোমা হামলার ফলে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষকে দ্রুত সৈন্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে, এবং এই রূপান্তর যুদ্ধের মানবিক দিককে জটিল করেছে। ব্যক্তিগত গল্পগুলো দেখায় যে, যুদ্ধের শারীরিক ক্ষতি ছাড়াও মানসিক ও সামাজিক প্রভাব গভীর। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সংঘাতের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ, তবে ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রূপান্তর এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেশের স্থিতিশীলতা নির্ধারণে মূল চাবিকাঠি হবে।



