বাংলা ভাষা, চিন্তা ও আত্মপরিচয়ের মূলভিত্তি হিসেবে, কোনো জাতির সত্তা গঠনে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। ভাষা হারিয়ে গেলে মানসিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যায় এবং জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বাস্তবতা ইতিহাসের বহু ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
মানব মনোবিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্বের গবেষণা দেখায় যে শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশের প্রথম ধাপটি মাতৃভাষার মাধ্যমে সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে ঘটে। মাতৃভাষায় শিক্ষা সৃজনশীলতা বাড়ায়, আত্মবিশ্বাস জোরদার করে এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি শক্তিশালী করে। অন্যদিকে, ভাষাগত বিচ্ছিন্নতা মানসিক চাপ, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং সামাজিক বিভাজনের দিকে ধাবিত করে।
যেসব ব্যক্তি নিজের মাতৃভাষা ত্যাগ করে অন্য ভাষায় আত্মগোপন করেন, তারা যদিও কোনো সংকীর্ণ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন, তবু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলেন। ভাষা শুধুমাত্র শব্দের সমষ্টি নয়; এটি ইতিহাস, প্রবাদ, লোককথা, সঙ্গীত ও সাহিত্যের ভাণ্ডার।
বিশ্বে প্রায় সাত হাজার ভাষা রয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাষাবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক শতাব্দীতে হাজার হাজার ভাষা নিঃশেষ হবে। এ ধরনের ক্ষতি কেবল সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই নয়, মানব জ্ঞানেরও ক্ষয় ঘটাবে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এই বিষয়ের স্পষ্ট উদাহরণ। মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করা হয়েছিল, তা স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রেরণায় পরিণত হয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের (২১ ফেব্রুয়ারি) প্রতিষ্ঠার মূল কারণ।
ডিজিটাল যুগে নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে। প্রাথমিক প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে রোমান হরফে বাংলা লেখার অভ্যাস গড়ে ওঠে। পাকিস্তান শাসনকালে আরবি বা রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রচেষ্টা জনমতের শক্তিশালী বিরোধের মুখে ব্যর্থ হয়। তবে আজকের ডিজিটাল পরিবেশে অজ্ঞতা ও সুবিধার কারণে কখনো কখনো আবার রোমান হরফে লেখা দেখা যায়।
প্রযুক্তি এখন ভাষা সংরক্ষণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ইউনিকোড, বাংলা কীবোর্ড, অভ্র, জি-বোর্ডের মতো উচ্চারণভিত্তিক ইনপুট পদ্ধতি বাংলা লেখাকে সহজতর করেছে। ফলে ভাষা ব্যবহারকে নিয়ে অজুহাতের স্থান ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।
বাংলা বাক্য বাংলার অক্ষরে লিখা কেবল রুচির বিষয় নয়; এটি সামাজিক দায়িত্বেরও অংশ। বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে ইংরেজি ও অন্যান্য বিদেশি ভাষা শিখা অপরিহার্য, তবে তা মাতৃভাষার অবমূল্যায়নের কারণ হওয়া উচিত নয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রয়োগ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি গ্রাম বিদ্যালয়ে বাংলা মাধ্যমিক পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞান ও গণিতের বিষয়বস্তু স্থানীয় ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা জটিল ধারণা সহজে বুঝতে পারছে এবং আত্মবিশ্বাসে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে, কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলেছে। ফলে তারা ভাষা সংক্রান্ত আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে এবং সামাজিক সংযোগে বাধা অনুভব করছে। এই দৃষ্টান্ত দেখায় যে ভাষা নীতি সঠিকভাবে সমন্বয় না করলে শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সুতরাং, ভাষা সংরক্ষণ ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করা ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয় দায়িত্ব। সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজে বাংলা লেখার পরিবেশ তৈরি করা, মিডিয়াতে মাতৃভাষার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং শিক্ষায় বাংলা ভিত্তিক পাঠ্যক্রমের প্রসার এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।
অবশেষে, পাঠকদের জন্য একটি ব্যবহারিক পরামর্শ: দৈনন্দিন জীবনে বাংলা লিখতে ও পড়তে সময় নির্ধারণ করুন, যেমন প্রতিদিনের নোট, সামাজিক মিডিয়া পোস্ট বা কাজের নথি বাংলায় রূপান্তর করুন। এভাবে ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমে মাতৃভাষার ব্যবহার বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভাষা সংরক্ষণের ভিত্তি দৃঢ় হবে।



