ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, বিদায়ি অর্থ উপদেষ্টা, নতুন অর্থ মন্ত্রীর কাছে একটি সাকসেসর নোট উপস্থাপন করেছেন। নোটে তিনি রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি কমানোর ওপর তাত্ক্ষণিক দৃষ্টি দিতে আহ্বান জানিয়েছেন।
নোটের প্রধান সুপারিশের মধ্যে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চলমান সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন, কর অব্যাহতি নীতির পুনঃমূল্যায়ন এবং আয়কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন। এছাড়া কাস্টমস আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই সুপারিশগুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে। নোটে বর্তমান মূল্যস্ফীতি প্রবণতা, রাজস্ব খাতের অবস্থা এবং মুদ্রা, আর্থিক, বৈদেশিক খাতের সাম্প্রতিক উন্নয়নও বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার চলমান প্রকল্পগুলোর উল্লেখও রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দামের সামান্য বৃদ্ধি ফলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি ডিসেম্বরের ৮.৪৯ শতাংশের তুলনায় সামান্য বেশি এবং গত আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর। টানা তিন মাসে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে, পূর্বের কয়েক মাসে কিছুটা হ্রাসের পর।
অন্যদিকে, দেশি ও বিদেশি উত্স মিলিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব সংগ্রহ না হওয়ায় সরকারকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হচ্ছে, যার ফলে ঋণ ও সুদ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোকে কঠিন করে তুলছে।
অধিকাংশ বাজেটের ব্যয় ঋণ সেবা করতে গিয়ে, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মতো মৌলিক সেক্টরের জন্য তহবিলের ঘাটতি বাড়ছে। তাই বিদায়ি অর্থ উপদেষ্টা রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন, যাতে ঋণ নির্ভরতা কমে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের অংশ হিসেবে, এনবিআরকে দুইটি স্বতন্ত্র সংস্থায় বিভক্ত করার জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এক সংস্থা রাজস্ব সংগ্রহ ও প্রশাসনিক কাজের দায়িত্ব নেবে, আর অন্যটি কর নীতি প্রণয়ন, গবেষণা ও সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এই কাঠামোগত পরিবর্তন রাজস্ব ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে গৃহীত হয়েছে।
নোটে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুদ্রা ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ এবং উন্নয়ন সহযোগীর সহায়তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক দৃশ্যপটকে প্রভাবিত করছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণবহুল বাজেটের চাপ নীতি নির্ধারণে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সুপারিশ অনুযায়ী, যদি রাজস্ব সংগ্রহের কাঠামো শক্তিশালী করা যায় এবং কর নীতিতে স্বচ্ছতা আনা যায়, তবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে, কাস্টমস আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল ট্যাক্স সিস্টেমের মাধ্যমে আয় বাড়িয়ে ঋণ সেবার চাপ কমানো যাবে।
সারসংক্ষেপে, নতুন অর্থ মন্ত্রীর সামনে উপস্থাপিত নোটে রাজস্ব বৃদ্ধি, কর সংস্কার এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই নীতি দিকনির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে, বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের সম্ভাবনা বাড়বে।



