একটি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালত ২৯ বছর বয়সী ইউক্রেনীয় নাগরিক অলেকসান্দ্র ডিডেনকোকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। ডিডেনকো কিয়েভে বসবাস করতেন এবং তিনি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিচয় চুরি অপারেশনে জড়িত ছিলেন, যার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জাল পরিচয় ব্যবহার করে চাকরি পেয়েছেন। এই কর্মীদের বেতন পিয়ংইয়াং-এ পাঠানো হতো, যা উত্তর কোরিয়ার আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পারমাণবিক অস্ত্র প্রকল্পের তহবিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ডিডেনকো ‘আপওয়ার্কসেল’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালাতেন, যেখানে বিদেশে কাজ করা ব্যক্তিরা, বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ানরা, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের চুরি করা পরিচয় কিনতে বা ভাড়া নিতে পারতেন। ন্যায়বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই সাইটে ৮৭০টিরও বেশি চুরি করা পরিচয় ব্যবহৃত হয়েছে। ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ২০২৪ সালে সাইটটি দখল করে তার ট্র্যাফিক নিজের সার্ভারে পুনঃনির্দেশিত করে।
পোল্যান্ডের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ডিডেনকোকে গ্রেফতার করে, পরে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর করা হয় এবং তিনি দোষ স্বীকার করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ডিডেনকো ক্যালিফোর্নিয়া, টেনেসি ও ভার্জিনিয়ার বাসিন্দাদেরকে কম্পিউটার হোস্ট করতে অর্থ প্রদান করতেন। এই ‘ল্যাপটপ ফার্ম’গুলোতে র্যাকের মতো সাজানো ল্যাপটপের ঘর ছিল, যা দূর থেকে উত্তর কোরিয়ান কর্মীদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মস্থলে কাজ করার ভান করতে সহায়তা করত।
উত্তর কোরিয়ান কর্মীদের এই ধরণের কার্যক্রমকে নিরাপত্তা গবেষকরা ‘ত্রি-ধারী হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে, সংবেদনশীল কোম্পানি তথ্য চুরি করে এবং পরে সেই তথ্যের ভিত্তিতে কোম্পানিগুলোকে গোপনীয়তা রক্ষা করতে বাধ্য করে। এই ধরনের কাজের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে।
সিকিউরিটি বিশ্লেষণ সংস্থা ক্রাউডস্ট্রাইক গত বছর উল্লেখ করেছে যে, উত্তর কোরিয়ান কর্মীদের সংখ্যা রিমোট ডেভেলপার বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত পদে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোতে প্রবেশের হার দ্রুত বাড়ছে। এই প্রবণতা পূর্বে দেখা যায়নি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে উদ্বিগ্ন করেছে।
ডিডেনকোর মামলায় বিচারিক রায়ের পর, যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে তীব্রতর নজরদারি বজায় রাখবে বলে জানিয়েছে। বর্তমানে ফেডারেল তদন্ত দলগুলো অনুরূপ সাইট ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই রায়ের ফলে উত্তর কোরিয়ার ‘আইটি কর্মী’ স্কিমের ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, এই ধরনের স্কিমের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়, ফলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়।
ডিডেনকোর বিরুদ্ধে আরোপিত পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তার সম্পদ জব্দের বিষয়েও ব্যবস্থা নিয়েছে। জব্দকৃত সম্পদের কিছু অংশ পুনরুদ্ধার করে উত্তর কোরিয়ার নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনকারী কার্যক্রমে ব্যবহৃত তহবিলের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
এই মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধবিরোধী সহযোগিতার একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে ইউরোপীয় ও আমেরিকান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা একসাথে কাজ করে সাইবার অপরাধের মূল উৎসে পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে একই রকম স্কিমের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, ডিডেনকোর দোষ স্বীকার এবং শাস্তি যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, উত্তর কোরিয়ার এই ধরনের রিমোট কর্মী স্কিম সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা কঠিন, এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।



