মুফতি আমির হামজা, কুষ্টিয়া‑৩ (সদর) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও ইসলামি বক্তা, শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) কুষ্টিয়ার ত্রিমোহনী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে খুতবার আগে বিরোধী ও সরকারী পার্টির সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের সামনে স্পষ্টভাবে বললেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে পার্টির শৃঙ্খলা ও ভোটের একতা বজায় রাখতে চাওয়া হচ্ছে।
হামজা উল্লেখ করেন, বিরোধী গোষ্ঠীর ৭৯ জন এবং সরকারী গোষ্ঠীর ২১২ জন সংসদ সদস্যকে “তীরের মতো সোজা” রেখে পার্টির অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, এই সংখ্যা পার্টির সামগ্রিক শক্তি ও সংহতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হল, কোনো বিচ্যুতি হলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধন করা।
বিরোধী দলের ৭৯ জনের মধ্যে চরমোনাইয়ের একজন এবং শেরপুরের একজনকে বাদ দিয়ে মোট সংখ্যা গঠিত হয়েছে, আর সরকারী পার্টির বাকি ২১১ জন সদস্যকে একত্রে কাজ করাতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সব সদস্যকে একত্রে কাজ করিয়ে শৃঙ্খলা রক্ষা করা হবে। তদুপরি, তিনি উল্লেখ করেন যে এই সমন্বয় কেবল সংখ্যাগত নয়, বরং নীতিগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
মুফতি আমির হামজা বলেন, “যদি কোনো সদস্য পার্টির বাইরে বা ভিতরে ঘুরে বেড়ায়, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করব” এবং “শক্তি ব্যবহার করে তাদেরকে সোজা রেখেই রাখব”। তিনি এই কথায় পার্টির শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন। একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন, কোনো সদস্যকে অতিরিক্ত দমন করা হবে না, বরং ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতিতে পরিচালনা করা হবে।
হামজা দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, ন্যায়-অন্যায়ের ভিত্তিতে অবস্থান নির্ধারণের কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, নিজের দলের লোককে চাঁদাবাজি করলে কোনো সমস্যা হবে না, অন্য দলের লোককে চাঁদাবাজি করলে তা ন্যায়বিচার নয়। এই বক্তব্যে তিনি পার্টির ভিতরে ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি আরও বলেন, ন্যায়সঙ্গত আচরণই দীর্ঘমেয়াদে পার্টির সুনাম রক্ষা করবে।
তার মতে, “মানুষের প্রতি হিসাব থাকবে, তাই ন্যায়সঙ্গতভাবে কাজ করতে হবে”। তিনি এই নীতিকে পার্টির অভ্যন্তরীণ নীতি হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানান। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি পার্টির সকল সদস্যকে সমানভাবে বিবেচনা করার গুরুত্ব জোর দিয়ে বলছেন।
নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে তিনি জানান, তিনি এক লাখ তিরিশ হাজার তিনশো ভোট পেয়েছেন, তবে এই ভোট শুধুমাত্র তার নয়, প্রায় চার লাখ ভোটারকে অন্তর্ভুক্ত করে। তিনি ভোটারদেরকে “ভাই‑বোনের মতো” বিবেচনা করে, আগামী পাঁচ বছর দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া তিনি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন, এ কথায় তিনি দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন।
সেই দিন সকাল ৯টায়, মুফতি আমির হামজা কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদ সদস্য হিসেবে তার কার্যক্রম শুরু করেন। এই অনুষ্ঠানে পার্টির নেতাকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক এবং স্থানীয় বাসিন্দা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তিনি কর্মীদের সঙ্গে হাতে হাতে কাজ করে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সময় তিনি কর্মীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজের গুরুত্ব ও নাগরিক সেবার দায়িত্বের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “সদস্যদের কাজের মাধ্যমে জনগণের কাছে আমাদের সেবা পৌঁছে দিতে হবে” এবং এই ধরনের উদ্যোগে পার্টির সামাজিক দায়িত্বের প্রকাশ ঘটবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই ধরনের কার্যক্রম পার্টির ইতিবাচক চিত্র গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
বিরোধী দলের কিছু নেতা এই পরিকল্পনাকে “রাজনৈতিক চাপে গিয়ে শৃঙ্খলা রক্ষার প্রচেষ্টা” বলে সমালোচনা করেন, তবে একই সঙ্গে পার্টির অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন। তারা যুক্তি দেন, শৃঙ্খলা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ পার্টির স্বায়ত্তশাসনকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তারা পার্টির মধ্যে স্বতন্ত্র মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি হামজা ও তার দল এই পরিকল্পনা কার্যকর করে, তবে সংসদে ভোটের শৃঙ্খলা ও পার্টির ঐক্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে তারা সতর্ক করেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ পার্টির স্বায়ত্তশাসনকে সীমাবদ্ধ করতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশ্লেষকরা এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দেন।
সামগ্রিকভাবে, মুফতি আমির হামজার এই ঘোষণায় সরকারী ও বিরোধী উভয় পার্টির সংসদ সদস্যদের শৃঙ্খলা রক্ষার ইচ্ছা স্পষ্ট হয়েছে। তিনি পার্টির অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দিয়ে, আগামী পাঁচ বছর দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আগামী মাসে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কিভাবে রাজনৈতিক গতিপথকে প্রভাবিত করবে, তা দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।



