নেটফ্লিক্স মেক্সিকোর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য স্টপ-মোশন অ্যানিমেশন ‘সয় ফ্রাঙ্কেল্ডা (I Am Frankelda)’ অধিগ্রহণের ঘোষণা করেছে এবং ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী স্ট্রিমিং শুরু করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। ছবিটি স্প্যানিশ ভাষায় তৈরি এবং আর্তুরো ও রয় আমব্রিজ ভাইদের পরিচালনায় সম্পন্ন হয়েছে।
চলচ্চিত্রের কাহিনী ১৯শ শতাব্দীর মেক্সিকোতে স্থাপিত, যেখানে ফ্রাঙ্কেল্ডা নামের এক প্রতিভাবান লেখিকা তার অন্ধকারময় গল্পগুলোকে সমাজের উপেক্ষার মুখে দেখেন। তার সৃষ্টিগুলোকে অবমূল্যায়ন করা সত্ত্বেও, ফ্রাঙ্কেল্ডা তার কণ্ঠ দমন করতে অস্বীকার করে এবং লেখালেখি চালিয়ে যায়।
ফ্রাঙ্কেল্ডার দমিত কণ্ঠস্বর তার স্বপ্নের জগতে প্রবেশের দরজা খুলে দেয়, যেখানে তার নিজস্ব সৃষ্ট দানবগুলো বাস্তবে রূপ নেয়। এই কল্পনাপ্রবাহে তাকে গাইড করে হের্নেভাল, এক দুঃখভোগী রাজপুত্র, যিনি স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের সীমানায় আটকে আছেন। দুজনকে একসাথে কাজ করতে হয় কাল্পনিক ও বাস্তব জগতের ভারসাম্য রক্ষা করতে, নতুবা উভয় জগত ধসে পড়বে।
একই সময়ে, দুষ্ট লেখক প্রোকুস্টেস এবং তার সহচররা ফ্রাঙ্কেল্ডার সৃজনশীলতা দখল করার ষড়যন্ত্র চালায়। তারা তার গল্পকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে ক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনা করে। ফ্রাঙ্কেল্ডা ও হের্নেভালের সম্পর্ক শক্তি ও অভিশাপ উভয়ই হয়ে ওঠে, এবং তাদের বন্ধনকে পুনর্লিখন করতে হলে ফ্রাঙ্কেল্ডাকে অস্তিত্বের সীমা অতিক্রমকারী প্রেমের মুখোমুখি হতে হয়।
গল্পের মূল লক্ষ্য হল ফ্রাঙ্কেল্ডার গল্পকার হিসেবে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা, যাতে অন্ধকার শক্তি তার কল্পনাকে গ্রাস না করে। তিনি যদি নিজের কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, তবে উভয় জগতের সমন্বয় রক্ষা করা সম্ভব হবে। এই সংগ্রামই ছবির কেন্দ্রীয় থিম হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
‘সয় ফ্রাঙ্কেল্ডা’ মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটি ভিত্তিক স্টুডিও সিনেমা ফ্যান্টাসমা-তে তৈরি হয়েছে, যেখানে আমব্রিজ ভাইরা লিখেছেন, পরিচালনা করেছেন এবং প্রযোজনা করেছেন। স্টুডিওটি স্থানীয় অ্যানিমেশন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মেক্সিকোর অ্যানিমেশন শিল্প আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গিলেরমো দেল টোরো, ‘পিনোকিও’ এবং ‘ক্যাবিনেট অফ কিউরিওসিটিজ’ এর স্রষ্টা, এই চলচ্চিত্রে পরামর্শদাতা হিসেবে যুক্ত ছিলেন এবং মেক্সিকোর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য স্টপ-মোশন অ্যানিমেশনের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। দেল টোরো চলচ্চিত্রের সৃজনশীল দিক এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জে নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি পূর্বে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে সহযোগিতা করে ফ্রান্সের গোবেলিন্স প্যারিসকে স্টপ-মোশন স্টুডিওতে রূপান্তরিত করতে সহায়তা করেছেন।
দেল টোরোর মতে, ‘সয় ফ্রাঙ্কেল্ডা’ মেক্সিকোর অ্যানিমেশন ইতিহাসে একটি মাইলফলক এবং দৃঢ়তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও শিল্পের প্রতি ভালোবাসার ফলাফল। তিনি এই কাজকে মেক্সিকোর অ্যানিমেটরদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মন্তব্য চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক আকর্ষণ বাড়াতে সহায়তা করবে।
‘সয় ফ্রাঙ্কেল্ডা’ ৫৩তম অ্যানি অ্যাওয়ার্ডে সর্বোত্তম স্বাধীন ফিচার ফিল্মের জন্য মনোনয়ন পেয়েছে, যা এই সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত হবে। এই স্বীকৃতি চলচ্চিত্রের গুণগত মান এবং সৃজনশীলতা নির্দেশ করে। মনোনয়নটি মেক্সিকোর অ্যানিমেশন শিল্পের উত্থানকে আরও দৃঢ় করে।
চলচ্চিত্রের কণ্ঠশিল্পী তালিকায় মেক্সিকোর পরিচিত কণ্ঠশিল্পীরা অন্তর্ভুক্ত, যদিও সম্পূর্ণ তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি। কণ্ঠশিল্পীরা ফ্রাঙ্কেল্ডা ও হের্নেভালের চরিত্রে জীবন্ত রঙ যোগ করেছে। তাদের পারফরম্যান্স ছবির আবেগময় গভীরতা বাড়িয়ে তুলেছে।
নেটফ্লিক্সের এই পদক্ষেপ মেক্সিকোর অ্যানিমেশন শিল্পকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্টপ-মোশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এই অনন্য গল্পটি বিশ্বব্যাপী দর্শকদের নতুন অভিজ্ঞতা প্রদান করবে। ২০২৬ সালে স্ট্রিমিং শুরু হলে, মেক্সিকোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও আধুনিক কল্পনা একসাথে উপভোগ করা যাবে।
চলচ্চিত্রের নির্মাণ প্রক্রিয়ায় প্রচলিত হাতে তৈরি পুতুল, সেট এবং বিশেষ প্রভাবের সমন্বয় ব্যবহার করা হয়েছে, যা শিল্পের সূক্ষ্মতা ও শ্রমের প্রতিফলন। মেক্সিকোর অ্যানিমেটররা আন্তর্জাতিক মানের স্টপ-মোশন প্রযুক্তি আয়ত্ত করে এই প্রকল্পে সফলভাবে প্রয়োগ করেছে। এই প্রযুক্তিগত দিকটি চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়াল আকর্ষণকে বাড়িয়ে তুলেছে।
‘সয় ফ্রাঙ্কেল্ডা’ এর গল্পের মূল থিম হল সৃষ্টিকর্তা ও তার সৃষ্টির মধ্যে দ্বন্দ্ব, যা মানবিক আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা ও দমনের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার প্রচেষ্টা। ফ্রাঙ্কেল্ডার যাত্রা দর্শকদেরকে সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। এই বার্তা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রেরণা জোগাবে।
নেটফ্লিক্সের মাধ্যমে এই চলচ্চিত্রের বিশ্বব্যাপী মুক্তি মেক্সিকোর অ্যানিমেশন শিল্পকে নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেবে এবং স্থানীয় প্রতিভাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে সহায়তা করবে। ভবিষ্যতে আরও মেক্সিকান অ্যানিমেটরদের কাজ নেটফ্লিক্সে দেখা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সহযোগিতা উভয় পক্ষের জন্য সমৃদ্ধিকর হবে।



