গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ আদালত একটি রায় দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে পারস্পরিক ও দেশভিত্তিক শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তি বাতিল করেছে। রায়টি হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি-রপ্তানি খাতে তাত্ক্ষণিক প্রভাব ফেলবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক পরিকল্পনা প্রথম প্রকাশ পায় এপ্রিলে রোজ গার্ডেনে, যেখানে তিনি “লিবারেশন ডে” নামে একটি অনুষ্ঠানে নতুন শুল্ক তালিকা উপস্থাপন করেন। এই তালিকায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হয়, যদি তারা তার গ্রিনল্যান্ড ক্রয় পরিকল্পনাকে সমর্থন না করে।
শুল্কের এই বিস্তৃত তালিকা বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেন। তবে রায়ের পরেও শুল্ক নীতির সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে না, কারণ শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু শুল্কই রায়ের আওতায় আসে।
সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মূল বিষয় হল ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৯৭৭ সালের আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন (IEEPA) ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের চেষ্টা করেছিলেন, যা এখন অবৈধ বলে ঘোষিত হয়েছে। এই আইনটি জরুরি অবস্থায় একতরফা শুল্ক আরোপের অনুমতি দেয়, কিন্তু রায়ে বলা হয়েছে যে এটি দেশভিত্তিক ও পারস্পরিক শুল্কের জন্য প্রযোজ্য নয়।
রায়ের ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্বে ঘোষিত কিছু শুল্ক বাতিল হয়েছে, তবে সব শুল্কই নয়। লিবারেশন ডে পরবর্তী আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রির গড় শুল্ক হার প্রায় ১৫% এ স্থিত হয়েছিল। সর্বোচ্চ আদালতের রায় এই হারকে তাত্ত্বিকভাবে অর্ধেকের নিচে নামিয়ে দেয়, তবে এখনও ৬% এর উপরে রয়ে যায়।
এই ৬% হার ২০২৫ সালের শুরুর গড় শুল্কের তিনগুণের সমান, কারণ অন্যান্য আইনি ভিত্তিতে আরোপিত শুল্কগুলো এখনও কার্যকর রয়েছে। ফলে মোট শুল্কের গড় হার ৬% এর উপরে থাকে, যদিও কিছু শুল্কের প্রভাব হ্রাস পেয়েছে।
শুল্কের আর্থিক প্রভাবের হিসাব দেখায়, ১৯৭৭ সালের IEEPA ভিত্তিক শুল্ক থেকে গত বছর গড়ে প্রায় ১১% শুল্ক সংগ্রহ হয়েছে। এই শুল্কের আয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্বে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তা স্থিতিশীল হয়েছে।
আমদানিকর্তারা উচ্চ শুল্কের দেশগুলো থেকে সরবরাহ শৃঙ্খল পরিবর্তন করে চীনের মতো দেশ থেকে পণ্য আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। ফলস্বরূপ, চীন থেকে পোশাক ও খেলনা ইত্যাদি পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
কিছু আমদানিকর্তা শুল্কের বাড়তি খরচ নিজে শোষণ করে, ফলে ভোক্তাদের উপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমে যায়। এই পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসে সহায়তা করেছে, যদিও শুল্কের মোট আর্থিক প্রবাহ এখনও উচ্চ মাত্রায় রয়েছে।
শুল্ক থেকে অর্জিত রাজস্ব গত বছর প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলার ছিল, যা পূর্বের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই আয় স্থিতিশীল হয়েছে, যা শুল্ক নীতির দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সর্বোচ্চ আদালতের রায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য কৌশলে একটি বড় বাধা সৃষ্টি করেছে, তবে তিনি অন্যান্য আইনি পদ্ধতি ব্যবহার করে শুল্ক নীতি চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখেন। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে শুল্কের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রায়ের পরেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ হবে না; বরং তিনি নতুন আইনি কাঠামো বা কংগ্রেসের সমর্থন দিয়ে শুল্ক আরোপের চেষ্টা করতে পারেন। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতিতে অনিশ্চয়তা বজায় রাখবে।
পরবর্তী ধাপে কংগ্রেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে, কারণ শুল্কের দীর্ঘমেয়াদী বৈধতা ও পরিসর নির্ধারণে আইনসভার অনুমোদন প্রয়োজন। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোও এই রায়ের প্রভাব নিয়ে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে পারে।



