গুগল পরিচালিত পাঁচ সপ্তাহের “Flow Sessions” প্রোগ্রাম শেষ হয়েছে, যেখানে দশজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল স্বতন্ত্র স্রষ্টাদের দ্রুত, কম খরচে এবং নতুন সৃজনশীল পদ্ধতিতে কাজ করার সুযোগ প্রদান করা। অংশগ্রহণকারীরা গুগলের AI টুলসেটের সহায়তায় তাদের গল্পকে ভিজ্যুয়াল রূপে রূপান্তরিত করেছেন।
একজন ফিলিপিনো চলচ্চিত্র নির্মাতা ব্র্যাড ট্যাঙ্গোনানের “Murmuray” নামের ছোট চলচ্চিত্রের উদ্বোধনী দৃশ্যটি বিশেষভাবে নজরকাড়া। গল্পটি হাওয়াইয়ের গ্রামীণ বাড়ির পেছনের বাগানে শুরু হয়, যেখানে নায়কটি একটি পুরনো ফটো দেখতে পায় এবং হঠাৎ এক অদ্ভুত স্বপ্নময় জগতে প্রবেশ করে। দৃশ্যটি স্বপ্নময় আলো, ধূসর রঙের টোন এবং অদ্ভুত চরিত্রের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে, যা ট্যাঙ্গোনানের পূর্বের শৈলীর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, তবে এইবার পুরো প্রক্রিয়াটি এআই দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
ট্যাঙ্গোনান গুগলের “Flow Sessions”-এর অংশ হিসেবে AI টুল ব্যবহার করে চলচ্চিত্রের প্রতিটি উপাদান তৈরি করেছেন। তিনি গুগলের জেমিনি, ইমেজ জেনারেটর ন্যানো বানানা প্রো এবং চলচ্চিত্র জেনারেটর ভিও ব্যবহার করে দৃশ্য, চরিত্র এবং সাউন্ড ডিজাইন করেছেন। এই টুলগুলো তাকে শুটিং, এডিটিং এবং ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের কাজকে উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত সম্পন্ন করতে সহায়তা করেছে।
প্রোগ্রামের সময়কাল পাঁচ সপ্তাহের, যার মধ্যে অংশগ্রহণকারীরা গুগলের AI প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন করে বিভিন্ন টুলের প্রশিক্ষণ ও ব্যবহার শিখেছেন। প্রতিটি স্রষ্টা নিজস্ব ধারণা ও স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করেছেন, এবং AI সিস্টেমের মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত করেছেন। এই পদ্ধতি প্রচলিত চলচ্চিত্র উৎপাদনের তুলনায় সময় ও বাজেটের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় এনে দিয়েছে।
বহু টুলের মধ্যে গুগলের জেমিনি ভাষা মডেলটি স্ক্রিপ্ট রাইটিং ও ডায়ালগ জেনারেশনে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে ন্যানো বানানা প্রো ছবির স্টাইল ও রঙের প্যালেট নির্ধারণ করেছে। ভিও টুলটি সম্পূর্ণ শটের সিকোয়েন্স তৈরি করে, ক্যামেরা মুভমেন্ট ও এডিটিং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করেছে। এই সমন্বিত সিস্টেমের ফলে স্রষ্টারা কম মানবসম্পদে উচ্চমানের ভিজ্যুয়াল ফলাফল পেয়েছেন।
অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের কাজও বৈচিত্র্যময় ছিল। হাল ওয়াটমফের “You’ve Been Here Before” শিরোনামের চলচ্চিত্রটি হাইপাররিয়ালিস্টিক ভিজ্যুয়ালকে কার্টুনিশ স্টাইলের সঙ্গে মিশিয়ে সকালবেলার রুটিনের গুরুত্বকে হালকা ভাবে উপস্থাপন করেছে। ট্যাবিথা সুয়ানসনের “The Antidote to Fear is Curiosity” নামের কাজটি এআই ও মানব সম্পর্কের দার্শনিক দিক নিয়ে আলোচনা করে, যেখানে বিমূর্ত চিত্র ও প্রশ্নবোধক সুর ব্যবহার করা হয়েছে।
এই চলচ্চিত্রগুলো নিউ ইয়র্কের সোহো হাউসে শেষ বছরের শেষের দিকে প্রদর্শিত হয়। প্রদর্শনীতে দর্শক ও শিল্প পেশাজীবীরা উপস্থিত ছিলেন, এবং সকল কাজই এআই ব্যবহার সত্ত্বেও স্বতন্ত্র শৈলীর পরিচয় দিয়েছে। কোনো কাজই কেবল এআই-সৃষ্ট নিম্নমানের ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হয়নি; বরং সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রযুক্তির সমন্বয়কে প্রশংসা করা হয়েছে।
গুগল ফ্লো সেশনসের মাধ্যমে দেখা যায় যে এআই টুলগুলো স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য দ্রুত এবং সাশ্রয়ী উৎপাদন প্রক্রিয়া সরবরাহ করতে পারে। প্রচলিতভাবে বড় বাজেট, বড় টিম এবং দীর্ঘ শুটিং সময়ের প্রয়োজনীয়তা এখন কমে এসেছে। স্রষ্টারা একা বা ছোট দলে কাজ করে উচ্চমানের ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট তৈরি করতে পারছেন, যা পূর্বে সম্ভব ছিল না।
তবে এই সুবিধার সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও যুক্ত। এআই টুলের ব্যাপক ব্যবহার মানে মানবসম্পদের প্রয়োজন কমে যাওয়া, যা কিছু ক্ষেত্রে কাজের একাকিত্ব বাড়াতে পারে। চলচ্চিত্র নির্মাণের ঐতিহ্যবাহী সহযোগী পরিবেশের পরিবর্তে একক স্রষ্টা অধিক সময় স্ক্রিপ্ট ও ভিজ্যুয়াল তৈরি করতে পারে, যা সৃজনশীল একাকিত্বের দিকে ধাবিত হতে পারে।
ভবিষ্যতে গুগল এবং অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই টুলকে আরও উন্নত করে, স্বয়ংক্রিয়তা ও মানবিক সৃজনশীলতার সমন্বয় বাড়াতে পারে। স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন গল্পের ফরম্যাট, ভিজ্যুয়াল স্টাইল এবং বিতরণ পদ্ধতি অনুসন্ধান করতে পারবে। এভাবে এআই কেবল উৎপাদন খরচ কমাবে না, বরং শিল্পের সীমানা প্রসারিত করবে।
সারসংক্ষেপে, গুগলের “Flow Sessions” প্রোগ্রাম দেখিয়েছে যে এআই টুলের সঠিক ব্যবহার স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং সৃজনশীল সম্ভাবনা উন্মুক্ত করে। যদিও একাকিত্বের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সঠিক সমন্বয় ও মানবিক স্পর্শের সঙ্গে এআই চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন দিগন্ত তৈরি করতে সক্ষম।



