বেথ দে আরাউজো পরিচালিত আত্মজীবনীমূলক নাটক ‘জোসেফিন’ বর্তমানে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে প্রদর্শিত হচ্ছে। এই চলচ্চিত্রে চ্যানিং টাটাম, গেমা চ্যান এবং নবাগত মেসন রিভস প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। ১২ বছর ধরে প্রকল্পটি গড়ে তোলার পর, ‘জোসেফিন’ সানড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবে গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কার ও অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড দুটোই জয় করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রকল্পটি প্রথমবার সানড্যান্স ডিরেক্টরস ল্যাবে উপস্থাপিত হয়েছিল, যেখানে বেথ দে আরাউজো তার প্রথম ফিচার ফিল্মের স্বপ্ন প্রকাশ করেন। তবে বিষয়বস্তুর সংবেদনশীলতা এবং বাস্তব ঘটনার ভিত্তি হওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হয়ে ওঠে। এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য তাকে বহুবার স্ক্রিপ্ট পুনর্লিখন ও তহবিল সংগ্রহে সময় ব্যয় করতে হয়।
কাস্টিং প্রক্রিয়ায় গেমা চ্যান প্রাথমিকভাবে যুক্ত ছিলেন, তবে পরবর্তীতে দে আরাউজো ‘সফট & কুইয়েট’ (২০২৩) ছবির কাজ শেষ করার পর চ্যানিং টাটামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। টাটাম প্রকল্পে স্বাক্ষর করার পরই চলচ্চিত্রের শুটিং সম্ভব হয় এবং পুরো টিমের কাজ দ্রুত এগিয়ে যায়। এই ধারাবাহিকতা ‘জোসেফিন’কে শেষ পর্যন্ত স্ক্রিনে আনতে সহায়তা করে।
‘জোসেফিন’ সানড্যান্সে অর্জিত দুইটি পুরস্কার চলচ্চিত্রের গুণগত মান ও দর্শকের স্বীকৃতি নিশ্চিত করেছে। গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কারটি শিল্প সমালোচকদের প্রশংসা ও বিচারকের সম্মানজনক স্বীকৃতি, আর অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ডটি দর্শকদের সরাসরি সমর্থনকে প্রতিফলিত করে। এই সাফল্যই বার্লিন ফেস্টিভ্যালে চলচ্চিত্রকে প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করার প্রধান কারণ।
চলচ্চিত্রের কাহিনী দে আরাউজোর নিজের শৈশবের স্মৃতি থেকে উদ্ভূত। তিনি আট বছর বয়সে সান ফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন গেট পার্কে তার পিতার সঙ্গে একটি যৌন আক্রমণ থামিয়ে দিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা তাকে অতিরিক্ত সতর্কতা ও ভয়ের মিশ্রণ অনুভব করায়, যা তিনি চলচ্চিত্রের মূল থিম হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
চিত্রে আট বছর বয়সী জোসেফিন (মেসন রিভস) তার পিতা ড্যামিয়েন (চ্যানিং টাটাম) সঙ্গে পার্কে দৌড়াতে গিয়ে একটি নির্মম ধর্ষণ দৃশ্যের সাক্ষী হয়। আক্রমণটি শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে রিয়েল-টাইমে উপস্থাপিত হয়, যেখানে পিতা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগে অপরাধীকে তাড়া করে এবং মেয়েটিকে একা রেখে যায়। এই দৃশ্যটি দর্শকের সামনে শিশুর অশ্রু ও আতঙ্ককে তীব্রভাবে প্রকাশ করে।
ফিল্মটি অতিরিক্ত সতর্কতা ও যুক্তিসঙ্গত ভয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য তুলে ধরতে চায়। দে আরাউজো উল্লেখ করেন যে, শিশুর চোখে বিশ্বকে দেখার সময় অযৌক্তিক সতর্কতা এবং বাস্তবিক নিরাপত্তা উভয়ই একসাথে উপস্থিত থাকে। এই দ্বৈততা চলচ্চিত্রের বর্ণনায় গভীরতা যোগ করে এবং দর্শকের মধ্যে সহানুভূতি জাগায়।
দে আরাউজোর মতে, ‘জোসেফিন’ তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত একটি শিল্পকর্ম, যা অতীতের ট্রমা কীভাবে বর্তমানের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে তা অনুসন্ধান করে। তিনি অতিরিক্ত সতর্কতা ও ভয়কে শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্গঠন করে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে চান। এই দৃষ্টিভঙ্গি চলচ্চিত্রকে শুধুমাত্র একটি গল্প নয়, বরং সামাজিক সচেতনতার একটি মাধ্যম করে তুলেছে।
বার্লিন ফেস্টিভ্যালে ‘জোসেফিন’ প্রদর্শনের পর দর্শক ও সমালোচকরা এর সাহসী বর্ণনা ও শক্তিশালী পারফরম্যান্সকে প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে গেমা চ্যানের সূক্ষ্ম অভিনয় এবং চ্যানিং টাটামের দৃঢ় পিতার চরিত্রকে উচ্চ প্রশংসা করা হয়েছে। চলচ্চিত্রের রিয়েল-টাইম দৃশ্যাবলী ও শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপিত ট্রমা দর্শকদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
বেথ দে আরাউজোর এই দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টা শেষমেশ আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি পেয়েছে, যা চলচ্চিত্র শিল্পে নারীর কণ্ঠস্বরকে আরও দৃঢ় করে তুলবে। ‘জোসেফিন’ শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত স্মৃতির পুনর্নির্মাণ নয়, বরং সমাজে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার বিষয়গুলোকে আলোকিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ভবিষ্যতে এই চলচ্চিত্রের আরও স্ক্রিনিং ও বিতরণ পরিকল্পনা রয়েছে, যা আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছাবে এবং ট্রমা মোকাবিলার আলোচনাকে এগিয়ে নেবে।



